প্রিটেন্ড প্লে : শিশুর মেধা বিকাশে অনন্য হাতিয়ার

প্রিটেন্ড প্লে : শিশুর মেধা বিকাশে অনন্য হাতিয়ার

অনেক সময়ই আমরা দেখি যে, দু-তিন বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী বাচ্চারা একা একা খেলছে অথবা কল্পিত নানা চরিত্রের সাথে কথা বলছে। কখনো তারা ডাক্তার সেজে ঘরের আসবাবপত্রকে রোগী বানিয়ে ইনজেকশন দিচ্ছে, ওষুধ খাওয়াচ্ছে, কখনো শিক্ষক সেজে নিজের খেলনা পুতুল চেয়ার টেবিলকে পড়াচ্ছে, ছড়াগান ও কবিতা শোনাচ্ছে।

আবার কখনো জোর করে খাওয়াচ্ছে, এমনকি ঝগড়াও করছে। কখনো দেখা যায় শিশুরা তাদের পছন্দের নানা কার্টুন চরিত্র বা রূপকথার গল্পের চরিত্র যেমন ফ্রোজেন’-এর অ্যানা ও এলসা সেজে নিজেরাই অভিনয় করছে।

চুলে গামছা বা ওড়না প্যাঁচিয়ে ডিজনি চরিত্র রাপুনজেল সাজছে। কখনো বাচ্চারা নিজেকে টম এন্ড জেরি, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান অথবা মাশা বা প্রিয় অন্য কোনো কার্টুন চরিত্রের মতো কল্পনা করে খেলাধুলায় মেতে উঠছে।

আবার আমরা দেখতে পাই দুই বা বেশি সংখ্যক শিশু এক বাড়িতে থাকলে তারা কেউ গৃহকত্রী সেজে কাজের নির্দেশ দিচ্ছে, বকা দিচ্ছে কিংবা গল্প করছে। তারা মা-বাবার চরিত্রে নিজেদের কল্পনা করছে। হয়তো বাসার অন্যান্যদের কাজের নির্দেশনা দিচ্ছে। শিশুদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় এই বানিয়ে বানিয়ে খেলা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।

শিশুদের এই প্রিটেন্ড প্লে-কে সাধারণত আমরা এক রকম খেলা বা বিনোদন হিসেবেই দেখি। কিন্তু শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ এবং নানা সামাজিক দক্ষতা তৈরিতে এ ধরনের খেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না।

শিশুরা যখন নানা চরিত্রে নিজেদের কল্পনা করে এবং সে অনুযায়ী কথা বলে তখন তাদের ভাষা শেখা ও ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়তে থাকে। দক্ষতা বাড়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দ ব্যবহার করার।

নানা পরিস্থিতিতে যেমন রাগ হলে, অভিমান করলে, আদর বা শাসন করলে বড়দের কণ্ঠস্বর বা ভাষা যেমন পরিবর্তিত হয় তেমনি শিশুরাও অনুকরণ করতে করতে পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণগুলো শিখে ফেলে।
এভাবেই শিশুর যোগাযোগের সামাজিক দক্ষতা বাড়তে থাকে।

অন্যদের সাথে প্রিটেন্ড প্লে­ করে তার গল্প তৈরি করার কিংবা উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করার ভালো চর্চা হয়, যা কিনা পরবর্তীতে শিশুর ভাষা শেখায়, লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে।

একটি শিশু যখন তার খেলনাগুলোর সাথে কথা বলে তাদেরকে জীবন্তপ্রাণির মতো কল্পনা করে, তাদেরকে খাওয়ায়, যত্ন নেয়, ভালোবাসে তখন তার ভেতরে আবেগিক বিকাশ ঘটে। এভাবে শিশুর ভেতরে এমপ্যাথি জাতীয় ধারণার বিকাশ লাভ করে।

টেডিবিয়ার যখন অসুস্থ হয় বা ব্যথা পায় শিশু তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কল্পনায় তাকে ব্যান্ডেজ পরিয়ে দেয়, ওষুধ খাওয়ায় এবং এগুলোর মাধ্যমেই অসুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত অন্যান্য মানুষের জন্য কিছু করার বোধ তার ভেতরে তৈরি হয়।

এ ধরনের খেলার মাধ্যমে শিশু নিজেই নানা রকম পরিস্থিতি কল্পনা করে নানা সমস্যার সমাধান করে। যেমন তার পুতুল শিশুটি হয়তো স্কুলে যেতে চাচ্ছে না, সে মা-বাবা সেজে পুতুল শিশুটিকে নানাভাবে বোঝায়, কিংবা তার খেলনা হাঁস খেতে চাচ্ছে না বা ঘুমাতে যাচ্ছে না, শিশুটি তখন অভিভাবকের মতো খেলনা হাঁসকে খেতে বা দাঁত ব্রাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধান সংক্রান্ত দক্ষতা এবং শিশুর চিন্তা করার শক্তি বাড়তে থাকে।

শিশুরা কল্পনাপ্রবণ, তারা আসলে ঘরের যে কোনো খেলনা, আসবাবপত্র, রান্নাঘরের তৈজসপত্র এমনকি জামা জুতোকেও নানা চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে। তাদের সাথে কথা বলে, এতে করে তাদের কল্পনা করার শক্তি বাড়ে।

একাধিক শিশু যখন শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, ডাক্তার, নার্স ও রোগী ইত্যাদি ভূমিকায় খেলতে থাকে তখন তাদের ভেতরে টিমওয়ার্ক করার দক্ষতা তৈরি হয়। এমনকি মতবিরোধ বা ঝগড়াঝাঁটির মাধ্যমেও শিশুর অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের ক্ষমতা বাড়ে।

শিশুদের খুব পরিচিত একটা প্রিটেন্ড প্লে হচ্ছে রাঁধুনি সেজে নানান কল্পিত খাবার-দাবার রেঁধে নিজে খাওয়া, বন্ধুবান্ধবকে খাওয়ানো।
কখনো কখনো তারা বড়দের মত করে ঘরবাড়ি গোছানো, পেপার পড়া কিংবা অন্যদের সেবা করার অভিনয় করে। এভাবে তাদের মধ্যে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় দক্ষতার ব্যাপারে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে প্রিটেন্ড প্লে এর মাধ্যমে শিশুর নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলবদ্ধভাবে কাজ করা, নির্দেশনা অনুসরণ করা, বিবাদ মেটানো ইত্যাদি সামাজিক দক্ষতা লাভ করে। এতে করে শিশুর আত্মনির্ভরশীল হতে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধের বিকাশ ঘটে।

প্রিটেন্ড প্লে বা বানিয়ে বানিয়ে খেলা বা কল্পনা প্রবণতা শিশুকে আরো নানাভাবে সাহায্য করে। তাই আপনার শিশুকে এ ধরনের খেলায় উৎসাহিত করুন। তার আবেগিক ও মানসিক বিকাশের পথে বাধা দেবেন না।

তবে তারা কী ধরনের খেলা খেলছে, বা কী বলছে সেগুলো খেয়াল রাখবেন। যদি অনুকরণ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক কোনো আচরণ বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে থাকে, তাহলে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

খেয়াল করতে হবে শিশুরা টিভি বা ইউটিউবে কী দেখছে, অন্য শিশু বা গৃহকর্ম সহায়তাকারীদের সাথে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে। শিশুর প্রিটেন্ড প্লে এর আচরণগুলো যদি বয়স উপযোগী না হয় বা অশোভন হয়, সেক্ষেত্রে তাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে শোধরানোর চেষ্টা করতে হবে।

লেখক : কাজী তাহমিনা, লেখক ও শিক্ষক ( ইংরেজি বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :