নিজে নিজে যদি ইংরেজি শিখতে চান

নিজে নিজে যদি ইংরেজি শিখতে চান

মফস্বল থেকে আসা বাংলা মাধ‌্যমের ছাত্রী ছিলাম আমি। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। ভর্তি হয়ে দেখলাম, ইংরেজি মোটামুটি লিখতে পারলেও বলার ক্ষেত্রে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। এদিকে সব লেকচার দেওয়া হয় ইংরেজিতে । আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম বেশ বহির্মুখী স্বভাবের।

অনুষ্ঠান আয়োজন, ক্লাস সংক্রান্ত বিষয়সহ নানা ব‌্যাপারে কথা বলতে হতো শিক্ষকদের সঙ্গে। শিক্ষকরা যাবতীয় কথা বলতেন ইংরেজিতে।

শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে প্রথম বছরে এত বেশি ভুলভাল ইংরেজি বলেছি, এখন ভাবলে নিজেরই হাসি পায় । আমার সৌভাগ্য যে আমার শিক্ষকরা কথা বলার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন, ভুল ইংরেজি শুনে হেসে ফেলেননি। আর এভাবেই ভুল করতে করতেই ইংরেজিতে কথোপকথন শেখার শুরু আমার।

মজার বিষয় হচ্ছে স্কুল বা কলেজে কোনদিন ইংরেজিতে কথা না বলা এই আমি, কোথাও ইংরেজি কথোপকথন/ স্পোকেন ইংলিশের কোন কোর্স না করা এই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে একটি বৃত্তি নিয়ে ছয় সপ্তাহের জন্য আমেরিকা যাই।

এই বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো: ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা, আগের সমস্ত পরীক্ষার ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রম।

 এই যে প্রথম বর্ষের ভুলভাল ইংরেজি বলা আমি নিজের প্রচেষ্টায় তৃতীয় বর্ষে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে ডিকিনসন কলেজে ৬ সপ্তাহের কোর্স করতে যাওয়ার সুযোগ পেলাম, তার পেছনে আমার নিজে নিজে ইংরেজি শেখার প্রচেষ্টা অনেকটা সাহায্য করেছে ।

 আমি রাতারাতি ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে উঠিনি। মোটামুটি দক্ষতা অর্জন করতে আমার বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছে। আর এর পেছনে কেবল আমার স্কুল/ কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাবা-মার অনুপ্রেরণা ও সহায়তার পাশাপাশি কিছু কৌশল অবলম্বন আর ইংরেজিতে অবিচ্ছিন্ন মনোযোগও আমাকে অনর্গল ইংরেজি বলা শিখতে সাহায্য করেছিল।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আজকে আমি কিছুটা লেখার চেষ্টা করছি যাতে করে সহজে নিজে নিজে ইংরেজি শেখার যাত্রা শুরু করা যায়।

১- ভুলকে ভয় পাবেন না

যারা নিজেরা শেখার চেষ্টা করতে চান তাদেরকে প্রথমেই যেটা করতে হবে তা হলো- ভুলকে ভয় না পাওয়া, শুরুতেই নিখুঁত উচ্চারণ ও নির্ভুল হওয়ার ব্যাপারে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করা।

যেকোনো কিছু শিখতে গেলে শুরুতে ভুল হবে- এটা স্বাভাবিক- এ বিষয়টা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। একটা ছোট শিশু হাঁটতে শেখার আগে বারবার পড়ে যায়, সাঁতার শিখতে গেলে বারবার নাকানি-চুবানি খেতে হয় ,সাইকেল চালানো শিখতে গেলে দু-একবার পড়ে যেতেই হয়।

তেমনি শুধু ইংরেজি নয়,  যেকোন ভাষা শেখা বা যেকোন স্কিল অর্জন করতে গেলে আমাদের ভুল হতেই পারে। তাই ভুল নিয়ে খুব বেশি ভাববো না, শুধু চেষ্টা চালিয়ে যাব – এ বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

 বন্ধু/ভাইবোন/ জীবনসঙ্গী মিলে একসঙ্গে চর্চা করা শুরু করুন

 আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে ইংরেজিতে কথোপকথনের চর্চা শুরু করা । চর্চা করার ক্ষেত্রে দলবেঁধে কাজ করা খুবই উপকারী। এক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধব, ভাইবোন, জীবনসঙ্গী বা আগ্রহী যে কাউকে নিয়ে চর্চা করা যেতে পারে ।

আর যদি একেবারেই কাউকে না পাওয়া যায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে কথা বলার অভ্যাস করা যেতে পারে। নানা টপিক বা বিষয় ঠিক করে প্রথমে তা নিয়ে ভাবুন। কিছুক্ষণ পরে খুব সহজ বাক্যে ইংরেজিতে এগুলো বলার চেষ্টা করুন।

যেমন নিজের সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে, নিজের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পড়াশোনা সম্পর্কে, নিজের জেলা সম্পর্কে, ‌প্রিয় নায়ক কিংবা প্রিয় বই- এরকম যেকোন বিষয়ের উপর নিজে নিজে ২/৩ মিনিট বলার অভ্যাস করতে পারেন।

শুরুতে সহজ বিষয়গুলোর উপরে বলতে পারেন। ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়লে কঠিন বিষয়গুলো চর্চা করা যেতে পারে। ইংরেজিতে কথা বলার এই চর্চা প্রতিদিন জারি রাখতে হবে । খুব বেশি না ৫ মিনিট /১০ মিনিট বা আধঘণ্টা, যতক্ষণ ভালো লাগে ততক্ষণ চর্চা করুন।

শুরুতেই খুব বেশি চাপ নেওয়ার দরকার নেই। আনন্দের সাথে শিখুন, শেখা দ্রুত হবে।

৩-নিয়মিত ইংরেজি পড়ার অভ্যাস তৈরি করা নিয়মিত ইংরেজিতে কিছু না কিছু পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। যার যে বিষয় পছন্দ দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি থেকে সে বিষয়গুলো পড়া যেতে পারে। যেমন: যারা খেলার খবরে আগ্রহী তারা স্পোর্টস নিয়ে, যারা রান্নাবান্নায় আগ্রহী তারা লাইফ-স্টাইল ম্যাগাজিন থেকে রেসিপি পড়তে পারেন।

ভালো মানের দৈনিক পত্রিকা কিংবা দেশি-বিদেশি নানা ওয়েব পোর্টাল থেকে পড়ার উপকরণ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ইংরেজির মান ভালো এ ধরনের রিসোর্স ব্যবহার করা উচিত। শুরুতেই খুব বেশি পড়তে হবে না।

 দৈনিক ১০/১৫ মিনিট করে পড়ার অভ্যাস প্রথমে তৈরি করলেই হবে। যাদের বই পড়ার অভ্যাস আছে তারা ইংরেজিতে লিখা ছোটগল্প, উপন্যাস পড়তে পারেন।

ইংরেজি সিনেমা দেখুন

 নতুন একটি ভাষা শেখার জন্য সিনেমা দেখা খুব কার্যকর একটি উপায়। অনেকেরই সিনেমা কিংবা টিভি/নেটফ্লিক্স সিরিজ দেখার অভ্যাস রয়েছে। ইংরেজি শিখতে চাইলে ইংরেজি সিনেমা দেখা যেতে পারে সাবটাইটেলসহ।

শেখার উদ্দেশ্যে দেখতে হলে একশন বা হরর ধরনের মুভি না দেখাই ভালো। ঘটনাবহুল, প্রচুর ডায়ালগ আছে এ ধরনের সিনেমা নির্বাচন করা উচিত।

সিনেমা বা টিভি সিরিজ দেখলে নেটিভ স্পিকারদের ইংরেজির ব্যবহার, ঠিক উচ্চারণ ইত্যাদি সম্পর্কে যেমন ধারণা পাওয়া যায়, শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, তেমনি তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কেও টুকটাক ধারণা লাভ করা যেতে পারে।

৪- ইংরেজি গান শুনুন

মাঝেমাঝে- ইংরেজি গানের ভক্ত না হয়ে থাকলেও ইংরেজি গান শুনুন মাঝেমাঝে। গান শোনার সময় গুগল সার্চ করে গানের কথাগুলো দেখে নিন। এবার শুনতে শুনতে মিলিয়ে নিন, গানের মূল কথা বোঝার চেষ্টা করুন।

দেখুন, গান শুনতে শুনতে শিখতে পারছেন নতুন নতুন শব্দ এবং সেগুলোর উচ্চারণ।

 ইউটিউব/টিভি দেখুন, ইংরেজি শিখুন

 ভালো ইংরেজি শিখতে হলে প্রতিদিন ভালোমানের ইংরেজিতে কিছু না কিছু দেখতে ও শুনতে হবে। একটা ভালো উপায় হলো ইউটিউব/ টিভিতে ইংরেজি অনুষ্ঠান দেখা।

আপনি যদি দেশবিদেশের খবরাখবরে আগ্রহী হন, সে ক্ষেত্রে বিবিসি/ সিএনএন বা যে কোন নির্ভরযোগ্য চ্যানেল দেখতে পারেন।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকাভারি, এনিম্যাল প্ল্যানেট , হিস্ট্রি চ্যানেল ইত্যাদিও দেখতে পারেন। আপনি যদি ভ্রমণে আগ্রহী হন, সে ক্ষেত্রে ইউটিউবে ভ্রমণ বিষয়ক নানা ডকুমেন্টারি/ ট্রাভেল চ্যানেল দেখতে পারেন।

এছাড়া এখন ইউটিউবে প্রচুর ইংরেজি শেখার ‘টিউটোরিয়াল’ পাওয়া যায়। সব পর্যায়ের শিক্ষার্থী বা যে কেউ ইংরেজি শেখার জন্য ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করতে পারেন।

ইউটিউবে ইংরেজিতে দেখতে পারেন ক্রিকেট, ফুটবল খেলার কমেন্ট্রি, বিজ্ঞান, সাহিত্য , ইতিহাস, সংস্কৃতি বিষয়ক ভিডিও অথবা মাস্টার শেফ জাতীয় রান্নার প্রতিযোগিতা।। তাই, যেভাবে শিখতে আপনার ভালো লাগে, সে আগ্রহের জায়গাগুলো খুঁজে বের করুন।  

একটি ভালো ডিকশনারি কিনুন অথবা অনলাইন , ডিজিটাল ডিকশনারি ব্যবহার করুন

কেবল ডিকশনারি পড়েই একজন মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে! যেকোন ইংরেজি শব্দ পড়ে/ দেখে/ শুনে অর্থ বুঝতে হলে ডিকশনারি দরকার। একটি শব্দের অর্থ বলার পাশাপাশি আরো অনেকভাবে ডিকশনারি আমাদের সাহায্য করে।

শব্দের অর্থ ছাড়াও ডিকশনারিতে উচ্চারণ গাইড, শব্দের ইতিহাস, প্রতিশব্দ (একই অর্থের সমার্থক অন্যান্য শব্দ), বিপরীত শব্দ (একটি শব্দের বিপরীত অর্থবোধক শব্দ), উদাহরণমূলক বাক্য এবং আরো অনেক তথ্য থাকে যা ইংরেজি ভাষায় শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করতে সহায়ক।

 প্রতিদিন ইংরেজি নিবন্ধ/ অনুচ্ছেদ পড়ুন

 ভালো মানের ইংরেজি পত্রিকা/বই থেকে প্রতিদিন অন্তত একটি অনুচ্ছেদ পড়ুন। মাঝেমাঝে বিভিন্ন জাতীয়-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে ইংরেজি নিবন্ধ পুরোটা/ অংশবিশেষ পড়ার চেষ্টা করুন।

একটি অনুচ্ছেদ পড়ার পরে তা মনে মনে কল্পনা করুন ও নিজের মতো বোঝার চেষ্টা করুন। অনুচ্ছেদ থেকে নতুন যে শব্দগুলো দেখবেন, তা একটি নোটবুকে লিখে রাখুন। ইংরেজি শিখতে হলে শুধু পড়লেই হবে না, বুঝে পড়তে হবে। মুখস্থ করার চেষ্টা না করে , বোঝার দিকে মনোযোগ দিন।

 যা শিখছেন তা ব্যবহার করুন

বিভিন্ন বই/ পত্রিকা/অনুচ্ছেদ বা লেখা পড়ে কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে যেসব শব্দ আপনি শিখছেন, তা প্রতিদিন ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন । নতুন শেখা শব্দটির অর্থ আরো সহজে বুঝতে গুগল ইমেজের সাহায্য নিন। যেমন, eglantine (European rose) শব্দটি লিখে গুগল ইমেজে খুঁজলেই আপনি ছবি পেয়ে যাবেন, যা আপনাকে শব্দটির অর্থ দীর্ঘদিন মনে রাখতে সাহায্য করবে।

নতুন শেখা শব্দটি দিয়ে এক/ দুটি বাক্য রচনা করুন, বন্ধুবান্ধবকে মেসেজ পাঠানো/ কথোপকথনে শব্দটি ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন। ৯-

৯-প্রতিদিন ইংরেজিতে কিছু না কিছু লিখুন

 দিনলিপি লেখা শুরু করুন। অন্তত এক/আধ পাতা করে হলেও লিখুন। প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতাগুলো, সুখ-দুঃখের অনুভূতি লিখে রাখুন। যেহেতু একান্তই নিজের ডায়েরিতেই সব লিখছেন, তাই কেউ আপনার ভাষাগত কিংবা ব্যাকরণগত ভুল ধরতে আসবে না। অতএব নির্দ্বিধায় মন খুলে লিখুন।

চাইলে নিকটজনের কাছে চিঠিও লিখতে পারেন । আপনার পড়াশনা সম্পর্কিত বিষয়ের উপর পত্রিকার আদলে ফিচার/ রিপোর্ট লিখার চেষ্টাও করতে পারেন। তবে, এক্ষেত্রে নিজের উপর চাপ দেবেন না। প্রতিদিন লিখতে ইচ্ছা না হলে সপ্তাহে দুচারবার লিখুন, আস্তে আস্তে অভ্যাস তৈরি করুন।

১০- ছোট ভাইবোন/ বাচ্চাকে ইংরেজি শেখায় সাহায্য করুন

ছোট ভাইবোন/ বাচ্চাকে শেখাতে গিয়েও আপনি ইংরেজির দক্ষতা বাড়াতে পারেন, গ্রামারের পুরোনো পড়াগুলো রিভাইজ করে নিতে পারেন। বাচ্চাদের ইংরেজি বইগুলোও দেখতে পারেন এবং সেগুলো পড়া শুরু করতে পারেন।

ইংরেজি কমিক্স বই, রুপকথার গল্প, শিক্ষামূলক গল্প বাচ্চাদের পড়ে শোনাতে গিয়ে নিজেরও শেখা হয়ে যাবে। তাই, দেরি না করে আজই শুরু করে দিন, নিজে নিজে ইংরেজি শেখার এই যাত্রা।

লেখক: কাজী তাহমিনা, সিনিয়র লেকচারার, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :