নিখুঁত না হলেই কি অসুন্দর

নিখুঁত না হলেই কি অসুন্দর

আশিকাগা ইউশিমাগা (১৪৩৬-১৪৯৮) ছিলেন জাপানের একজন শুগান। সে সময়ের অভিজাত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের শুগান বলা হতো। কোথাও কোথাও আবার আশিকাগা ইউশিমাগাকে রাজাও বলা হয়।

 সে যাই হোক, আশিকাগার খুব প্রিয় একটি সিরামিকের পাত্র ছিলো। একদিন পাত্রটি দুর্ঘটনাক্রমে হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়। তিনি পাত্রটিকে চীনে পাঠান মেরামত করে আনার জন্য। কিছুদিন পরে জিনিসটি মেরামত হয়ে ফেরত আসে। কতগুলো ধাতব পাত দিয়ে ভাঙা অংশগুলো কোনমতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। রাজার মোটেই পছন্দ হলো না। পাত্রটি দেখতে আরো বিচ্ছিরি লাগছিলো।

রাজার ইচ্ছে, তার পাত্রটি আবার আগের মত করে মেরামত করে দেয়া হোক। সেই তখন বুদ্ধের wabi sabi দর্শন থেকে অণুপ্রাণিত হয়ে জাপানেই সেই পাত্রটিকে মেরামত করে দেয়া হয় সোনা ব্যবহার করে। এতে পাত্রটির ভাঙা অংশগুলোকে অত্যন্ত যত্নের সাথে সোনা দিয়ে জুড়ে দেয়া হয় আর এতে পাত্রের সৌন্দর্যে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। সেই থেকে শুরু হয় জাপানি Kintsugi বা Kintsukuroi পদ্ধতিতে ভাঙা পাত্র মেরামত করার চল।

জাপানি শব্দ Kin অর্থ সোনা sugi অর্থ জুড়ে দেয়া আর kuroi অর্থ মেরামত করা । Kintsugi বা Kintsukuroi এর মানেটা তাই দাঁড়ায় এরকম সোনা দিয়ে মেরামত বা জোড়া দেয়া।

বুদ্ধের wabi sabi দর্শন মতে, ত্রুটিযুক্ত জিনিসের মধ্যেও সৌন্দর্য রয়েছে । জগতে কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। কিন্তু নিখুঁত না বলেই তা অসুন্দর , ব্যাপারটা তাও নয়।

খুঁতযুক্ত জিনিসের সৌন্দর্য অনুসন্ধান করাই wabi sabi দর্শন। সাধারণত কোনো কিছু ভেঙে গেলে ,নষ্ট হয়ে গেলে তা আমরা ফেলে দিই। কিন্তু জাপানে Kintsugi বা Kintsukuroi পদ্ধতিতে জিনিসটিকে রিসাইকেল করা হয়। তাছাড়া পুরোনো জিনিসের সাথে আমাদের যে স্মৃতি/ বন্ধন রয়েছে তাও অটুট থাকে। আর তাই সোনা, রূপা বা প্লাটিনামের মতো দামী ধাতু ব্যবহার করে সিরামিকের পাত্রগুলো ঠিক করা হয়ে থাকে। এটি জাপানের একটি শিল্প যা পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে চলে আসছে।

অনেক দিন আগে বন্ধু সোনিয়া তাবাসসুম একটা কথা বলেছিলো। আমি ভুলিনি। বলেছিলো, ‘’দ্যাখ তানিয়া, একটা ঝাড়ু অনেক দিন ব্যবহার করতে করতে যখন ফেলে দিই, তখনও কিন্তু মায়া লাগে। আর আমরা তো মানুষ!’’

সত্যি মানুষই যেন আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত আর ফেলনা! সমাজের বা পরিবারের এতটুকু প্রত্যাশা যদি আমরা পূরণ করতে না পারি , তাহলে কোনো মূল্যই নেই। যদি এ প্লাস না পাই, বিসিএস ক্যাডার না হতে পারি, মোটা বেতনের চাকরি না পাই, গাড়ি বাড়ি না করতে পারি, প্রেমের/দাম্পত্যের সম্পর্কে যদি ভাঙন ধরে… কেউ আমাদের গোনায় ধরে না। আমাদেরকে হতে হবে ১০০% নিখুঁত মানুষ!!!

মানুষ ফেলে দেবার ডাস্টবিন নেই বলেই নেহাত মানুষগুলো চুপচাপ রয়ে যায় কোথাও, ‘’একটি মানুষ খুব নিরবে নষ্ট হবার কষ্ট’ নিয়ে! কেউ কেউ তাল মেলাতে না পেরে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। অথচ এ জগতে নিখুঁত ব্যক্তিটি কে আসলে? আপনি? কী বললেন? আপনিও নিখুঁত নন?

বাইরে দিয়ে যতই ফিটফাট হই না কেন, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই একজন পোড় খাওয়া, রোদে পোড়া , হাড় জিড়জিড়ে অপুষ্টিতে ভোগা ভেঙে পড়া দুঃখী মানুষ বাস করে।

ভেঙে যাওয়া কোনো কিছু মেরামত করলেও তার দাগ থেকে যায়। থাকুক না হয় সে দাগ। ঐ দাগসহই জিনিসটি সুন্দর। আমরা যেন আমাদের জীবনের দাগগুলোকে আড়াল না করি। লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে না রাখি। বরং ঐ দাগ/ত্রুটি/খুঁতসহই হয়ে উঠি Kintsugi বা Kintsukuroi এর পাত্রগুলোর মতো শৈল্পিক সুন্দর ও দামী।

তানিয়া কামরুন নাহার, লেখক ।

এখানে মন্তব্য করুন :