দ্য লাঞ্চ বক্স

দ্য লাঞ্চ বক্স

মানুষের জীবন খুবই ছোট। এই ছোট এক জীবনে কত কী করতে হয় মানুষকে। তবে যাই করা হোক না কেন, সেই মানুষকে নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। কারণ,  বেঁচে থাকার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের জীবনীশক্তি আসে খাদ্য থেকে । তাইতো পেটে ক্ষুধা থাকলে দুনিয়ার কিছুই ভালো লাগে না।

সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছিলেন “ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়,পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” প্রচলিত কথা আছে, “পেটে লাগলে ক্ষিদা, লাগে না কিছু মিঠা”।

ক্ষুধা বা খাবারের প্রসঙ্গ নিয়ে এত কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আজকে যে মুভি নিয়ে আলোচনা করবো সেটার নামই হচ্ছে, দ্য লাঞ্চ বক্স।

দেখুন, সিনেমার একটি সিরিয়াস অংশে কীভাবে উত্থাপিত হলো খাবার বা ক্ষুধা। “আমি সব সময়ই ভাবতাম মানুষটা যখন চলে যাবে তখন আমি কি করবো? কিন্তু এখন? এখন শুধু আমার ক্ষুধা পাচ্ছে!”

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে, আপনার পছন্দের তিনটা বলিউড মুভির নাম বলেন, এক বা দুইয়ে কি বলবো  তা ভাবনার বিষয়। কিন্তু তিন নাম্বারে অবশ্যই ঝটপট উত্তর আসবে-দ্য লাঞ্চ বক্স।

পরের প্রশ্নটাই আসবে একটা মুভিতে গান নেই, মারামারি নেই, থ্রিল নেই।  এমনকি,  প্রেম করে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরা, ঘুরে বেড়ানো- আমাদের হরহামেশা দেখা এমন চিরাচরিত কোনো দৃশ্যই নেই তারপরেও এত ভালো লাগলো কেন?

গল্পটা হতে পারতো ইরফান খানের অথবা নিম্রিতা কউর এর অথবা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দীকির, অথবা সেই আন্টি যিনি এই মুভির খুবই শক্ত চরিত্র হয়েও একটা সিনের জন্য যাকে দেখতে পাইনি। কিন্তু দিন শেষে আমার কাছে গল্পটা হয়ে গেছে জীবন ঘনিষ্ঠ অথচ তিক্ত বাস্তব কিছু ডায়ালগের।

সাজান ফার্নান্দেজ, একজন বয়স্ক অফিস কর্মচারী, যিনি কিছুদিনের ভিতরেই অবসর নিবেন। তার স্ত্রী মারা যাওয়ায় তাকে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনিয়ে খেতে হয়। ইলা,  স্কুলে পড়া এক বাচ্চার মা, যার জীবনটা সন্তান পালন, ঘর সংসার সামলানো ও রান্নাবান্নাতেই কেটে যায়। ইলা তার স্বামীর জন্য দুপুরের খাবার পাঠায়, সেটা ডেলিভারিম্যানের ভুলে সাজানের কাছে চলে যায়।

এভাবেই শুরু হয় গল্প। গল্পের বড় একটা অংশ যাবে চিঠি পড়তে পড়তে। সাথে দেখবেন, কঠিন হৃদয় অফিস কলিগ থেকে বন্ধু হয়ে যাওয়া। গল্প নিয়ে বলতে গেলে বলতেই থাকতে হবে। তাই আর না বলি।

হুমায়ুন আহমেদ একবার বলেছিলেন, “রুচির রহস্য ক্ষুধায়। যেখানে ক্ষুধা নেই সেখানে রুচিও নেই।

অনেক মানুষ আছেন যারা বলেন তারা খেতে পারেন না বা ক্ষুধা লাগে না। অনেক সময় আমার নিজেরও ক্ষুধা লাগে না ঠিকমত। তখন দ্য লাঞ্চ বক্স দেখতে বসবেন। সাধারণ কিছু খাবার রান্না করেন ইলা, কিন্তু সেই সাধারণ খাবার এত যত্ন নিয়ে রান্না করেন দেখলেই যে কারো জিভে পানি চলে আসবে। এবং সেই খাবার যখন সাজান ফার্নান্দেস অত্যন্ত মজা করে গলাধঃকরণ করবেন, তখন আপনার আফসোস লাগবেই কেন আপনি এত সুন্দর খাবার খেতে পারছেন না। এই দুঃখ আপনার ক্ষুধা তিন গুণ বাড়িয়ে দিবে তা বলাই বাহুল্য।

দ্য লাঞ্চ বক্স মুভি আমার যে জন্য ভালো লাগে, সেটা অবশ্যই আমার দুই পছন্দের অভিনেতা একসাথে ছিলেন সেজন্য। তবে সব থেকে বেশি ভালো লাগে ডায়ালগের জন্য।

যেমন, এক সিনে ইলা চিঠিতে সাজানকে লিখছেb, “আমার মেয়ে শিখেছে ভুটানে গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট হিসাব করা হয় না, গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস হিসাব করা হয়। আমাদের এখানে কেন হয় না?

আরেক সিনে সাজান ইলাকে বলে “nobody buys a lottery ticket expired, Ila” প্রথমে মনে হবে কত সাধারণ ডায়ালগ, তারপরেই আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে।

মুভিটার পুরোটাই সুন্দর সুন্দর কথপোকথনে ভর্তি। একদৃশ্যে নাওয়াজ বলেন, “my mother said, always said, the wrong train can take you to the right station. ”

ইরফান বলেন, তোমার মা? তুমি না অনাথ?

তখন নাওয়াজ বলেন যে কোন কথার আগে আম্মা বলেছেন বললে কথাটার গুরুত্ব বেড়ে যায় ! কী অসাধারণ!

আরেক দৃশ্যে বলেন, স্যার আপনাকে আমি প্রথম যেদিন ট্রেনে প্রথম শ্রেণীতে উঠতে দেখি,আপনার সাথে যাওয়ার জন্য আমিও উঠেছিলাম। কিন্তু টিকিট ছিলো না আমার কাছে। ভয়ে ছিলাম, কখন কালেক্টর কী বলেন। তার পরেরদিনই আমি প্রথম শ্রেণীর পাস করে নিয়েছি। কেন নিয়েছি? যেন তিনি ইরফান খানের সাথেই যাওয়া আসা করতে পারেন। অসাধারণ একটা দৃশ্য ছিলো।

এভাবে বর্ণনা করতে গেলে পুরো মুভিই বলে যেতে হবে। প্রত্যেকটা দৃশ্য, সংলাপ অর্থবহ অসাধারণ।

ইরফানখান, নাওয়াজুদ্দিন সিদ্দীকির অভিনয় নিয়ে সন্দেহ করবে এমন কেউ আছে বলে মনে হয় না। এখানেও অসাধারণ অভিনয় করেছেন। সাথে নিম্রিতা কউর, তিনিও পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। সিনেমাটির অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চরিত্র ছিলেন ইলার উপর তালার আন্টি। তাকে একবারও দৃশ্যমান না করেও এত শক্তিশালী একটা চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারার জন্য অবশ্যই পরিচালক প্রশংসার দাবীদার।

সুখ জিনিসটা বড়ই আপেক্ষিক ব্যাপার। কারো কাছে একমুঠো ভাত সুখের জিনিস,কারো কাছে বাড়িগাড়ি জগতের সমস্ত ভোগের উপকরণও সুখের নয়। জীবনে সুখের জন্য পেট পূজো জরুরি, তেমনি মনের খোরাকও জরুরি। কিন্তু আমরা যা চাই সব সময় কি তা পাই??

একটা অবসর নিতে যাওয়া মানুষ, একজন মাঝবয়েসি মহিলা, একজন অফিস কলিগ, লাঞ্চবক্সের ভুল ডেলিভারির জন্য যে অসাধারণ কিছু হয় তা দেখতে বসে পড়ুন, কিন্তু অবশ্যই খালি পেটে না।  কারণ, প্রচুর ক্ষুধা লাগবে এই মুভি দেখতে গেলে। ধন্যবাদ রিতেশবাত্রা এ রকম সুন্দর মুভি উপহার দেয়ার জন্য।

লেখকঃ অন্বয় আকিব, ওয়ার্ল্ড ইউনিভারসিটি অব বাংলাদেশে বিবিএতে অধ্যয়নরত।

এখানে মন্তব্য করুন :