দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট

দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট

উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে, কুয়েতের অংশ বিশেষ দখল করে নিয়েছে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী। কুয়েতের কোনো এক মরুপ্রান্তরে অপারেশন ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ পরিচালনা করছে আমেরিকান সৈন্যরা। রুটিন টহলে বের হওয়া একদল আমেরিকান সৈন্যর ওপর শুরু হলো অতর্কিত হামলা।

ছোটো সেই দলটির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন বেন ম্যাক্রো (ডেনজেল ওয়াশিংটন) শত্রুপক্ষের আঘাতে গুরুতর আহত। দলের আরো কয়েকজন শত্রুপক্ষের গুলিতে নিহত। এ অবস্থায় দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড সার্জেন্ট রেমন্ড শ’র (লিয়েভ শ্রিবার) অসম সাহসিকতায় রক্ষা পায় দলটি।

তিনি একাই মেশিন গানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেন শত্রুপক্ষের সকল যান ও সেনাদের। তার এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আমেরিকান সরকার তাকে মেডেল অব অনার পদক দেয়।
যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু যুদ্ধের দগদগে স্মৃতি বয়ে বেড়ান ক্যাপ্টেন থেকে পদোন্নতি পেয়ে মেজর হওয়া মেজর ম্যাক্রো। টুকরো টুকরো ঝাপসা ঝাপসা কিছু স্মৃতি তাকে তাড়িত করে, নিয়ে যায় অচেনা কোনো এক স্থানে, সেখানে তিনি ক্ষণিকের জন্য দেখেন তার অধীনস্ত সেনাদের ক্ষতবিক্ষত দেহ ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ।

উপসাগরীয় যুদ্ধের ভয়াবহতা ছাপ ফেলেছিল সৈন্যদের উপর। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সেনাদের মধ্যে দেখা দেয় নানা উপসর্গ যা ‘গালফওয়ার সিনড্রোম’ নামে পরিচিত।

বেন ম্যাক্রো তার এ বিপর্যস্ত অবস্থাকে ‘গালফওয়ার সিনড্রোম’ ধরে নিয়ে বিষয়টা আমলে নেন না; কিন্তু সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায় যখন তার সঙ্গে একদিন দেখা হয় করপোরেল মেলভিনের ( জেফেরি রাইট)। সেদিনের সেই টহল দলে থাকা মেলভিন এখন কেমন যেন হয়ে গেছে, আচার আচরণ পাগলাটে ধরনের, চোখেমুখে ভয়ের ছাপ, সুস্থির হতে পারছে না কিছুতেই।
মেলভিন তার একটি ডায়েরি দেখায় সাবেক বসকে। সেখানে তিনি লিখে রেখেছেন প্রতিরাতে তার দেখা উদ্ভট সব স্বপ্নের বিষয় আসয়।


সার্জেন্ট রেমন্ড শ’ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নেমে পড়েছিলেন রাজনীতিতে। ওয়ার হিরো হিসেবে তার বিশেষ সুখ্যাতি, সবার কাছে বিশেষ সম্মানিত এবং দাপুটে কংগ্রেসম্যানও বটে।


তার মা এলেনর প্রেনটিস শ’ ( মেরিল স্ট্রিপ) নিজেও একজন প্রভাবশালী সিনেটর। যিনি নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি ব্যবহার করে ছেলের রাজনীতির ক্যারিয়ার মসৃণ করেছেন। উচ্চাকাঙ্খী এলেনর চান ছেলে হবে একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।

এজন্য এমন কোনো হীনও কাজ নেই তিনি যা করেন না। দলের বাঘাবাঘা নেতাদের প্রচ্ছন্ন হুমকিধামকি দিয়ে ও ভবিষ্যতে আমেরিকার কাল্পনিক ঝুঁকির দোহাই দিয়ে নিজের ছেলেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়ন আদায় করে নেন তিনি।

এদিকে মেজর ম্যাক্রো এইসব উদ্ভট স্বপ্নের কারণ খুঁজতে নিজেই নেমে পড়েন তদন্তে। একে একে টুকরো টুকরো সব ঘটনা জোড়া লাগতে শুরু করেন, বেরিয়ে আসতে থাকে ঘটনার পেছনের ঘটনা।
তিনি ঝুঝতে পারেন রেমন্ড শ’ সেদিন তাদের উপর কোনো হামলা থেকে বাঁচাননি, আসলে সেদিন কোনো হামলার ঘটনাই ঘটেনি। যা কিছু ঘটেছে তা তাদের মস্তিষ্কে রোপন করে দেওয়া হয়েছে।

মাঞ্চুরিয়ান গ্লোবাল করপোরেশন নামে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসায়িক ক্ষমতা বাড়াতে রেমন্ড শ’কে বাছাই করেছিল বহু আগে থেকেই। তাকে তাদের মতো করে গড়ে নিয়েছে। র‌্যামন্ড শ’ তাদের প্রোগ্রাম করা কলের পুতুল। তাকে যেভাবে খুশি সেভাবেই পরিচালনা করা যায়।

এসব কিছুই হয়েছে ক্ষমতালিপ্সু রেমন্ড শ’ এর মায়ের ইচ্ছায়। নিজের ছেলে যাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন সেজন্য মাঞ্চুরিয়ান করপোরেশনকে দিয়ে র‌্যামন্ড শ’ ও তার পুরো ব্যাটালিয়নের মস্তিষ্কের কিছু স্মৃতি বিলোপ করে নতুন স্মৃতি প্রবেশ করানো হয়।

অনেকটা হীরক দেশের রাজা সিনেমার সেই বিজ্ঞানীর আজব যন্ত্র আবিষ্কারের মতো। যেখানে সাধারণ জনগণ যন্তরমন্তরে যখন প্রবেশ করে, তখন ভুলে যায় আগের সব স্মৃতি, বলতে শুরু করে নতুন শেখানো বুলি।


সিনেমাটি পরিচালনা করেন জোনাথান ডেমে। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত রিচার্ড কনডনের একই নামের থ্রিলার বই থেকে সিনেমাটি নির্মিত। ১৯৬২ সালে দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট নামে প্রথম সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিল, অবশ্য ওই সিনেমার প্রেক্ষাপট ছিল কোরিয়ান যুদ্ধ।


পরের সিনেমাটি ২০০৪ সালে নির্মিত হলেও কিছু কিছু বিষয়ের অবতারণা বাস্তবেও সামান্য দেখা মিলে। যেমন আমেরিকার কিছু প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব‌্যবহার করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যারা নিজেদের সরকারি পদ পদবী ব্যবহার করেছেন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে লাভবান করে দিতে।

কোনো কোনো ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে এত নিষ্ঠুর আচরণ করতে দেখা যায়, যেন তারা বিবেক হারিয়ে ফেলেছে, অন্য কেউ তাদের পরিচালিত করছে। যেমনটা সিনেমায় দেখা যায়, র‌্যামন্ড শো তার মায়ের নির্দেশে দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যা করছে পানিতে চুবিয়ে। বাবাকে বাঁচাতে এসে তার মেয়ে ও একসময় রেমন্ডর ভালো লাগার মানুষটিকেও রেমন্ড অবলীলায় গলা টিপে মেরে ফেলে।

কোনো অনুশোচনা বা বেদনাবোধ নেই তার মধ্যে রেমন্ড শ’ এর মায়ের ভূমিকায় মেরিল স্ট্রিপ অনবদ্য অভিনয় করেছেন। নিজেকে ক্ষমতালোভী রাজনীতিক, কূটকৌশলে সেরা ও নিষ্ঠুর হিসেবে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেউ কেউ তার চুলের স্টাইলসহ পোশাকআষাক দেখে হিলারি ক্লিনটনেরও সঙ্গে তুলনা করেছেন। ডেনজেল ওয়াশিংটনের অভিনয়ের প্রশংসা নতুন করে আর করলাম না।

লেখক : শাহাদাত হোসেন, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে মন্তব্য করুন :