বহু প্রতীক্ষার তুষারপাত

বহু প্রতীক্ষার তুষারপাত

এবছর এতো তুষারপাত হলো যে তুষার ঝড়ে বির্পযস্ত আমেরিকা। ঝড়ের কবলে পড়ে একেবারে নাস্তানুবাদ অবস্থা। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ইলিনয়সহ প্রায় ১৮ অঙ্গরাজ্যে হানা দিয়েছে তুষার ঝড়।

এর প্রভাব পড়েছে প্রকৃতিতে, পাশাপাশি জীবনযাপনেও। বরফে ঢাকা পড়েছে সবুজ মাঠ, রাস্তাঘাট, লেকগুলো। পিচঢালা কালো রাস্তাগুলোকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে হাঁটু অবধি শ্বেতশুভ্র বরফ।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করেছে। বাঙালি ছেলে বলে কথা, বেশি দিন ঘরে বসে সময় কাটানোর অভ্যাস নেই।

তাই এরই মাঝে একদিন আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মিলে আড্ডা দিলাম তুষার ঝড়ের মধ্যে। গল্পগুজব করলাম, কফি খেলাম। বলা যায় তুষারপাত উদযাপন করলাম।

তুষারে ঢাকা পড়েছে পথঘাট যানবাহন। ছবি : লেথক

তুষারপাত আমার বরাবরই পছন্দের। শুধু আমি কেন, আমার মনে হয়, এইরকম বাঙালি বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার বরফ পড়া দেখতে ভালো লাগে না।

কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম, ভ্রমণপিপাসু মানুষের পছন্দের তালিকায় বেশ উপরের দিকেই থাকে তুষারপাত হয় এমন এলাকাগুলো। আর বাংলাদেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী নর্থ আমেরিকায় পড়তে আসেন, তারা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করেন তুষারপাত দেখার জন্য। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ক্যাম্পাস লেকে ভেসে বেড়ানো হাঁসেরা । ছবি : লেখক

 বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নর্থ আমেরিকায় পড়তে আসেন সাধারণত ফল (আগস্ট) সেশনে। এইসময় তুষারপাত হয় না। আবহাওয়া অনেকটা বাংলাদেশের বসন্তকালের মতই থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে একই ধরণের আবহাওয়া বিরাজ করে না।

মানচিত্রের উপরের দিকের অঙ্গরাজ্যগুলোতে শীত একটু বেশি থাকে। আর দক্ষিণে শীত কম, বলা যায় বাংলাদেশের মতই আবহাওয়া। তবে তুষারপাতটা কম বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গায়ই হয়।

আমি পড়াশুনা করছি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে। এর অবস্থান ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কার্বনডেল শহরে।

বরফে ঢাকা বাড়িঘর। ছবি : লেখক

কার্বনডেল ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক একটি ছোট্ট শহর, যার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রের একদম মাঝখানে। ফলে সব ধরণের আবহাওয়ার সংমিশ্রণ পাওয়া যায় এখানে।

বছরের তিন মাস ঠান্ডা আর তিন মাস গরম থাকে। বাকি ছয় মাস আবহাওয়া খুবই সুন্দর ।

বাংলাদেশ থেকে যারা এখানে পড়তে আসেন তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তুষারপাত দেখা। বিশেষ করে যারা আগে তুষারপাত দেখেনি তাদের অনুভূতিটা একেবারেই নতুনর।

আর তাদের সেই উচ্ছ্বাসের ঢেউ এসে আগে আশপাশের মানুষের মধ্যে। আগস্ট থেকে তারা অপেক্ষা করতে থাকে কখন তুষারপাত হবে।

মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও হাঁস লেকগুলোতে ভেসে বেড়ায়। ছবি: লেখক

আমার বউ গত আগস্টে দেশ থেকে আসেন। তার উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। প্রায় প্রতিদিনই আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করতো তুষারপাত কবে হবে?

অনেকসময় তিনি খুবই বিরক্ত হয়ে বলতেন, কার্বনডেল শহর খুবই পচা, কারণ এখানে তুষারপাত হয় না। অবশ্য তুষারপাত দেখার জন্য তাকে পাঁচ মাসের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি।

আমরা যারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকি আমাদের কাজকর্ম শুরু হয় ওয়েদার চ্যানেল চেক করার মধ্য দিয়ে। কারণ আবহাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে জামা পরতে হয় ও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বাইরে বের হতে হয়।

ওয়েদার চ্যানেলে দশ দিন কিংবা একমাসের আবহাওয়ার আপডেট আগে পাওয়া যায়। আমরা চেক করতে থাকি কোনদিন তুষারপাত হবে। যদি কোনো দিন ৩০ শতাংশ তুষারপাতের সম্ভাবনা দেখা যায় তাহলে ওই দিনটির জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। ও

এরই মাঝে একদিন বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। ছবি: লেখক

ইদিন কাছে আসতে না আসতে দেখা যেত তুষারপাতের সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। তখন আমাদের কষ্ট আর দেখে কে!

জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে এখানে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়ে। এইসময় তুষারপাতের সম্ভাবনাও বেশি থাকে। ফলে জীবনের প্রথম তুষারপাত দেখার জন্য এইসময় ওয়েদার চ্যানেল চেক করার প্রবণতাও বেড়ে যায়।

আমরা আলো না ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠি। একদিন ভোরবেলা চোখ খুলতেই মনে হলো বাসার ভেতরটা বেশি আলোকিত মনে হচ্ছে।

বাইরে তাকিয়ে দেখি ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা, রাস্তা সবই ধবধবে সাদা হয়ে আছে। বউকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই বললেন, দেখে মনে হচ্ছে লবনের মাঠ।

প্রসঙ্গত: আমাদের দুইজনের জন্মই কক্সবাজারে। ফলে সাদা ধবধবে লবণের মাঠ দেখেই আমরা বড় হয়েছি। তাই বরফে ঢাকা আঙ্গিনা দেখে আমার বউয়ের প্রথমে লবণের মাঠের কথাই মনে পড়েছে।

স্ত্রীর সঙ্গে লেখক

অবশ্য ওইদিন তুষারপাত খুব বেশি হয়নি। এর কয়েকদিন পরেই তুষারঝড় শুর  হলো। ধবধবে সাদা তুলার মতো তুষার উড়ে উড়ে পড়ছে চারদিকে। তাপমাত্র তখন মাইনাস ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আমরা এরই মধ্যে পা থেকে মাথা পর্যন্ত  ঢেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই বের হলাম তুষার ঝড় দেখবো বলে। বের হয়ে দেখি কোনো কোনো জায়গায় আমাদের হাঁটু পর্যন্ত তুষারের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।

আমার বউয়ের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। ওর সেই আনন্দ যেন আমাকেও ছুঁয়ে যায়। আমরা তুষারের বল বানিয়ে খেললাম কয়েক মিনিট।  ছোড়াছুড়ি করলাম। ছবিও তুললাম।

এই ঠান্ডায় দেখি কাঠবিড়ালি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটি পাখিও দেখলাম। তাদের জন্য খুব মায়া হচ্ছিল। আহারে এই ঠান্ডায় তাদের কত কষ্টই না হচ্ছিলো!

প্রচন্ড ঠান্ডায় হাতের আঙ্গুলগুলো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না বাইরে। বাসায় এসে কফিতে চুমুক দিলাম।

লেখক: জাহেদ আরমান, পিএইচডি গবেষক, সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :