জাহাঙ্গীরনগরের শূন্য কাম্পাসে প্রাণহীন ফাগুন

জাহাঙ্গীরনগরের শূন্য কাম্পাসে প্রাণহীন ফাগুন

ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রকৃতিতে বাজছে শীতের বিদায়ী সুর। উত্তুরে হাওয়া বিদায় নিয়ে দক্ষিণের বাতাসকে স্বাগত জানাচ্ছে।

নতুন রূপে-রঙে সেজেছে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন কচি পাতার সমারোহ আর বাহারি রঙের ফুলে মেতে উঠেছে বৃক্ষরাজি। বড় বড় গাছের ডালে একমনে কুহু কুহু ডাক ডেকেই চলেছে কোকিলেরা। কিন্তু কোকিলের সেই ডাক শুনে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পুরনো কোনো স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই । 

প্রতিবছর বসন্তের এই সময়ে ভিন্ন রূপে সেজে ওঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শতশত গাছপালা, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বন্যপ্রাণির অবাধ বিচরণ আর সবুজের সমারোহ বুকে ধারণ করে এই ক্যাম্পাস। আর বসন্তকালে ক্যাম্পাসের এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের বিভা স্পর্শ করে  সকলকে।

ছবি : সংগৃহীত

অথচ করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারণে ক্যাম্পাসের যে আসল প্রাণ সেই শিক্ষার্থীদের পদচারণা আর কলরব নেই। গত বছরের মার্চ মাস থেকে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। ফাঁকা ক্যাম্পাস। নেই শিক্ষার্থীদের পদচারণা, হাসির কল্লোল।

জমে না বটতলার আড্ডা, টারজান পয়েন্টে অকারণে প্রাণ খুলে হাসির দমকও নেই। টিএসসিতে বসে না নাচ-গানের আসর, লন্ডন ব্রিজের আশপাশে আর অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় না বন্ধুদের। চৌরঙ্গীর পুকুর পাড়ে ভিড় জমায় না মাছেরা ।

ছয় ঋতুর বৈচিত্রপূর্ণ দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। আর বসন্ত হলো ঋতুদের রাজা। শীতের শুষ্কতায় পাতা ঝরে গেলে গাছগুলোকে মনে হয় রিক্ত শূন্য। বসন্তের আগমনীতে সেই শূন্য ডালে  প্রাণ আসে। হালকা সবুজ  শিশু কচি পাতা গজায় ডালে ডালে। ফোটে রঙ বেরঙের ফুল।

ক্যাম্পাসে আমগাছের ডালে ডালে কচি মুকুলে ভরে উঠেছে। মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে সুরভিত হয়েছে প্রকৃতি। মৌমাছিরা ব্যস্ত হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে মধু আহরণে। বাহারি রঙের প্রজাপতিরা আনমনে ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে কাউকে।

ফাল্গুনের এলোমেলো হাওয়া কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়ার গাছগুলোকে যখন নাড়িয়ে দেয়, তারাও যেন এই সুযোগে একটুখানি নেচে নিচ্ছে। 

কৃষ্ণচূড়া, লাল পদ্ম, ক্যাসিয়া রেনিজেড়ার মতো হরেক রকমের ফুল আর কচি পাতার সবুজ রঙের আভায় প্রকৃতি পেয়েছে  নতুন রূপ, নতুন গতি, নতুন মাত্রা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা অনুষদের সামনের মহুয়া গাছে ফুটেছে নতুন ফুল। প্রতি বছর বসন্তের এই সময়টাতে মহুয়া তলায় হতো বসন্তবরণ উৎসব।

ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষার্থীসহ নানা প্রান্ত থেকে আসা  প্রকৃতিপ্রেমিরা মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করে প্রকৃতির এই শোভা। সঙ্গীতপ্রেমীরা বসন্তের গান রচনা করার সুর খুঁজে পায়। প্রেমিক প্রেমিকারা নতুন করে প্রেমের জাল বুনতে শুরু করে। সাহিত্যপ্রেমিরা সাহিত্যের নতুন রস খুঁজে পায় বসন্তের আগমনে।

বসন্তের আগমনে যেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ মিছিল হবার কথা সেখানে এবার যেন এক ধরনের শূন্যতা, শুনশান নিরবতা, কী এক হাহাকার।

বসন্ত এসেছে ঠিকই, তবে বসন্তকে বরণ করবার, স্বাগত জানানোর জন্য কেউ নেই। ক্যাম্পাসে বসন্ত এসেছে ঠিকই তবে বসন্তের সেই পূর্ণতা নেই।  শুধু তাকে বরণ করবার কেউ নেই বলে।

প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে বসন্তবরণ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। ‘বের হতো বিভিন্ন ধরনের শোভাযাত্রা। বসন্তপ্রেমিরা বাহারি রঙের পোশাক পরে বসন্তবরণ উৎসবে মেতে উঠত।  এবার এক ভিন্নরুপে বসন্ত এসেছে।

প্রত্যাশা রইল পৃথিবী থেকে সকল রোগ-শোক চলে যাক। মানুষের সান্নিধ্যে প্রকৃতি ফিরে পাক তার পূর্ণতা। আবারো আনন্দে ভরে উঠুক প্রিয় ক্যাম্পাস।

লেখক : ইমন ইসলাম, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা গনমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে মন্তব্য করুন :