ছেলের কাছে যে অঙ্গীকার করেছিলেন জো বাইডেন

ছেলের কাছে যে অঙ্গীকার করেছিলেন জো বাইডেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬ তম প্রেসিডেন্ট জোসেফ রবিনেট বাইডেন, জুনিয়র। ছবি : হোয়াইট হাউজ


জো বাইডেন তখন ওবামা প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে। নিজের বাড়ি ডেলাওয়েতে সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে এসেছেন । ছুটি কাটানো শেষ। এবার ফেরার পালা কর্মস্থল ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেদিনের সকালটা ছিল অত্যন্ত মনোরম, রৌদ্রোজ্জ্বল।

হঠাৎ দেখতে পেলেন, তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সিক্রেট সার্ভিসের এক এজেন্ট দৌড়ে আসছেন তার দিকে। চরম উত্তেজিত সেই এজেন্ট। দৌড়ে আসায় অল্পবিস্তর হাঁফাচ্ছেনও। কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম। কোনোমতে জো বাইডেনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘মি. ভাইস প্রেসিডেন্ট, মি ভাইস প্রেসিডেন্ট!’
‘দ্য জেনারেল ইজ ডাউন, দ্য জেনারেল ইজ ডাউন।’

বাইডেনের দেহরক্ষী যে জেনারেলের কথা বলছিলেন, তিনি হলেন ডেলাওয়ের’র এটর্নি জেনারেল বো বাইডেন। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বড় ছেলে।
১৯৭২ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল বাইডেনের পরিবার, সেই দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যায় তার দুই ছেলে। বো বাইডেন দুই ভাইয়ের মধ্যে বড়। কিন্তু সেদিনের দুর্ঘটনায় বাইডেন চিরতরে হারান তার প্রিয়তম স্ত্রী-কন্যাকে।


বো বাইডেনের খবর পাওয়ামাত্রই তক্ষুণি ছেলের বাসার দিকে দৌড় লাগালেন জো বাইডেন। গিয়ে দেখেন, বো স্ট্রোক করেছেন। সেই যে বো বাইডেনের নানা অসুখবিসুখের শুরু, এরপর নানা রোগে, কষ্টে ভুগে তার মৃত্যু হয়।

বো এর সঙ্গে বাবা জো বাইডেনের ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বাইডেনের বর্ণাঢ্য ও বহুমুখি জীবনে তিনি বরাবরই ছিলেন পারিবারিক মানুষ। মৃত্যুর আগে বো বাবাকে কায়দা করে ওয়াদা করিয়ে নিয়েছিলেন, যে তার কখনো ভেঙে পড়লে চলবে না। যেন সবসময় হাসিখুশি আর শক্তিশালী থাকেন।

ছেলের অন্তিম দিনগুলোতে শিয়রে বসে আবেগময় কথা হতো বাবা-ছেলের। সেখানে ছেলের ব্যক্তিগত আশা, স্বপ্নের কথাবার্তা ছাড়াও ঘুরেফিরে উঠত জো বাইডেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল লক্ষ্যের কথা।

আদরের ছেলের কাছে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছেন জো বাইডেন। ব্যক্তিগত শোক চাপা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘটনাাবহুল নির্বাচনে লড়ে ৪৬ তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হন জো বাইডেন। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী চেয়ারে বসলেন এমন এক ব্যক্তি যার ‘দু:খ দিয়ে জীবন গড়া’ কিংবা ‘বেদনা যার সাথী’। ভাঙা মন নিয়ে যিনি নিরবে কেঁদেই চলছেন, সব পেয়েও যার হৃদয়ে গভীর শূন্যতা।

আবার আসি বো বাউডেনের যন্ত্রণাময় জীবন অর্থাৎ অসুস্থতার দিনগুলিতে। যে যন্ত্রণার আগুনের আঁচে দগ্ধ হচ্ছিলেন বাবাও। স্ট্রোক করে অ্যাফেসিয়া- নাম ভুলে যাওয়া রোগে ভুগতে শুরু করেন বো। অথচ সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিউ ছিলেন সুঠামদেহী ও ফিট। দৌড়ে সেরা। সামরিক কলাকৌশলে যিনি সবার চেয়ে এগিয়ে।

২০১৩ সালে তার ধরা পড়ল গ্লাইওবাসটোমা নামে দুরারোগ্য ক্যানসার। হায়েনাটি তখন চতুর্থ ধাপে ছেয়েছে। এতকিছুর পরেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন বিউ। বাপ-দাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ গুন। বছর দেড়েক পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠেয় ডেলাওয়েরের গভর্নর পদে লড়ারও ইচ্ছাপোষণ করেন তিনি।

কিন্তু বাইডেন পরিবার খেয়াল করছিলেন, বড় ছেলের শরীর ভেঙে পড়ছে। শক্তসামর্থ্য ছেলে ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছেন কঙ্কালসার। ছেলেবেলায় জো বাইডেনের মা, তাকে সাহসী হওয়ার তালিম দিতেন এভাবে, ‘তাকাও, আমার চোখের দিকে তাকাও। বলো কখনো সাহস হারাবে না। কারণ তুমি সাহসী । এটাই তোমার বড় পরিচয়।’

ডেলাওয়ের একটি হাসপাতাল থেকেই ১৯৭৩ সালে সিনেটর হিসেবে শপথ নেন জো বাইডেন। এর কিছুদিন আগে দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে রক্ষা পায় বড় ছেলে বো বাইডেন ও ছোট ছেলে রবার্ট হান্টার। হাসপাতালের বিছানায় ছোট্ট বো বাইডেন। ছবি : এবিসি নিউজ।

মায়ের শিক্ষা ভোলেননি জো বাইডেন। পেছনে চোখের পানি ফেললেও, ছেলের অসুস্থ শয্যার সামনে বাইডেন পরিবার হাসিখুশি ভাব দেখাত। নিজেরা বসে আলোচনা করে ঠিক করেছে, বো- এর সামনে ক্যানসার কোন স্টেজে ছড়িয়েছে, শরীর খারাপ কি না এসব প্রসঙ্গ ভুলেও তুলবে না।

ওদিকে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানোর সময় ঘনিয়ে আসছে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে জো বাইডেন। একদিকে মৃত্যুশয্যায় কাতর প্রিয় সন্তান, অন্যদিকে দল ও সমর্থকদের প্রচন্ড চাপ। মানসিকভাবে টালমাটাল অবস্থা। ভক্তকুলের গভীর আবেগ উচ্ছাসে সিক্ত হয়ে তিনি হ্যাঁ বলে দিবেন দিবেন এমন একটা আবহও তৈরি হয়েছিল।
জো বাইডেন এক স্মৃতিকথায় বলেন, ও আমাকে বলত বাবা, এমন দু:খভরা চোখে আমার দিকে তাকিওনাতো। যাই হোক না কেন আমি ঠিকই সামলে নেব। তোমাকে শক্ত হতে হবে। হাসিখুশি থাকতে হবে। পরিবারের দরকার তোমাকে। আমরা চাই, তুমি শক্ত থাক।

পরিবারের সবাই স্বপ্ন দেখতেন বাইডেন একদিন হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেবার দুম করে সেই স্বপ্ন ভেঙে হলো চৌচির। এপ্রিল মাসে বো এর শরীর হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে যায়। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ২০১৫ সালের ৩০ মে বো মেরিল্যান্ড ওয়াল্টার রিড হাসপাতালের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

পিতার সামনে পুত্রের মৃত্যু, এরচেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে ? প্রিয়তম স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যুর অমোচনীয় ক্ষতের পাশে পড়ল আরো একটি গভীর ক্ষত। অনেকদিন লেগেছিল তার সেই অবস্থা থেকে সুস্থির হতে। সেই গভীর ক্ষতের বেদনানাশক যেন বো এর শেষ সময়ের পিতার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল।

১৯৯১ সালে সিনেটর হিসেবে বক্তব্য রাখছেন জো বাইডেন। ছবি: এবিসি নিউজ

বো বলেছিল, ‘বাবা, তুমি আমাকে কথা দাও, যাই কিছু হোক না কেন, তুমি ঠিক থাকবে। তুমি একটুও মুষড়ে পড়বে না, ভেঙে পড়বে না। কথা দাও আমাকে। আমার প্রিয় বাবা, কথা দাও, আমাকে কথা দাও, যে তুমি ঠিক থাকবে ।
জনপ্রিয় টিভি ব্যক্তিত্ব আপরাহ উইনফ্রে এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জো বাইডেন বলেছিলেন, জান? আমি যখন ছোট বাবাকে আমাকে ওয়াদা করিয়েছিলেন, যেন কখনো কোনো অভিযোগ না করি। বিশ্বাস কর, আমার ছেলেটা সারাজীবনে কখনোই কোনো কিছু নিয়ে অভিযোগ করেনি।

জো বাইডেনের আত্মজীবনীমূলক বইয়ের প্রচ্ছদ

জো বাইডেনের বই ‘প্রমিজ মি ড্যাড-এ ইয়ার অব হোপ, হার্ডশিপ এন্ড পারপাস’ এ বলেন, খুব ধীরে, খুব ধীরে ব্যাপারটা আমার কাছে খোলাসা হলো। আমি বুঝতে শুরু করলাম আসলে ও আমার কাছ থেকে কী চেয়েছিল। ও চেয়েছিল আমি যেন আবারও জনসেবায় মনপ্রাণ উজাড় করে জড়িয়ে পড়ি। ছেলের কাছে করা ওয়াদা পূরণের উদ্দেশে মাঠে নেমে পড়েন বাইডেন। দলকে জানিয়ে দেন, হ্যাঁ আমি লড়ছি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আমি প্রস্তুত।

এই যে লড়াইয়ে ফেরার মানসিকতা বাইডেনের পুরো জীবনে বারবার এটারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যেখানে তিনি হোঁচট খেয়েছেন সেখান থেকেই আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ‘সাহস’ নামে শক্ত ধাতু দিয়ে যে তাকে গড়ে তুলেছেন তার বাবা-মা। একনিষ্ঠ নিমগ্নতায় যেমন করে কুমোর আকার দেয় নান্দনিক শিল্পসামগ্রীর।


নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় ট্রাম্প যখন একের পর এক হুল ফুটিয়ে যাচ্ছিলেন বাইডেন তখনও বিভিন্ন প্রচারপ্রচারণায় মিডিয়ার সামনে বলেন, আমি এখনো গভীরভাবে ওর কথা ভাবি।

এ বছরের জানুয়ারিতে এক টিভি সাক্ষাৎকারে বাইডেন বলেন, ‘আমার নয়, আসলে বো বাইডেনেরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার উচিত ছিল। রোজ সকালে জেগে, বিশ্বাস করো জো (টিভি উপস্থাপক), কোনো কৌতুক না, আমি নিজে নিজে ভাবি, সত্যি কী ও আমাকে নিয়ে গর্ব করবে?’
ট্রাম্পকে এক কঠিন লড়াইয়ে হারিয়ে দেওয়ার পর, এখন নিশ্চয়ই বো বাইডেন দম্ভ করে বলবেন, আই এম দ্যা এলডেস্ট সান অব প্রেসিডেন্ট অব ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।


তথ্যসূত্র : এবিসি নিউজ, বিবিসি ও ইউটিউব।

লেখক: পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :