চীনের টুকরো ঘটনা

চীনের টুকরো ঘটনা

এক সারিতে নির্মিত বাড়িগুলো । ছবি : লেখক

ছোটবেলায় চীন দেশের একটি গল্প আমাদের পাঠ্য বইয়ে ছিল। কীভাবে সৌন্দর্যের নামে লোহার জুতা পরিয়ে পা ছোট করে রাখা হতো চীনা মেয়েদের। পড়ে এতো খারাপ লেগেছে ! চীন দেশের কথা তখনই জানলাম। 

বড় হতে হতে অন্য রকমভাবে চীনকে চিনতে লাগলাম। কোনো জিনিস দ্রুত নষ্ট হয়ে গেলে কিংবা জালজালিয়াতির প্রসঙ্গ আসলে দেশে শুনতাম, ‘চাইনিজ জিনিস’ তোÑ তাই এ অবস্থা।

সেই চীন দেশে আমি আছি সাত বছর ধরে। আমাকে চীনে আসতে হয়েছে আমার স্বামীর চাকরির সূত্রে। ও এখানে একটা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে ফার্মাসিস্ট হিসেবে আছে।

দেশে থাকতে শুনতাম, চীনের মানুষের দৈহিক গড়ন ছোটখাটো। নাক বোঁচা, চোখ সরু, গায়ের রঙ হলুদাভ ফর্সা। চীনে পা রেখে বুঝলাম আমার জানাশোনা আর আসল চিত্রে দুস্তর দূরত্ব। দেখলাম উচ্চতায় ওরা অনেক লম্বা। নাকও  দেখি ঠিক ঠাক। অনেকে দেখতে আমাদের মতোই। শুধু চোখের আকার ভিন্ন। 

দেশে আমার চোখের দিকে কেউ না তাকালে কী হবে, এখানে ওরা আমাদের চোখের দিকে চেয়ে থাকে।  অনেকে কৌতূহল লুকায় না। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় মনের কথা। বলে ফেলে আমার চোখ নাকি খুব সুন্দর!

যদিও প্রথম প্রথম বুঝতে পারতাম না ‘পিউলিও  পিউলিও’ কী। ওরা আমাদের দেখলেই একথা বলতো।  পরে জানতে পারলাম এর মানে হচ্ছে, সুন্দর।

আমরা প্রথম যখন আসি, প্রথমে পৌঁছাই কুনমিং, রাতের বেলা। বিশাল এয়ারপোর্ট দেখে মাথা খারাপ হওয়ার জোগার। নিজের দেশের এয়ারপোর্টের কথা মনে পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়। এদের এয়ারপোর্ট বিশাল, অনেক সুন্দর, কোনো ঝামেলাও নেই, সবকিছু হচ্ছে নিয়ম মেনে।

চীনের একটি বাজার । ছবি ; লেখক

যেহেতু রাতে এসে নামলাম তাই হোটেলে উঠতে হলো। রাতে তেমন ভালো করে শহরটি দেখা হয়নি। কারণ, আমাদের পৌঁছাতে দেরি হয়েছিল। তাই ভাবলাম খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ি, সকালে আমাদের আসল গন্তব্যের জন্য এয়ারপোর্টে যেতে হবে।

আমাদের গন্তব্য সাংহাই সিটি। হোটেলে পৌঁছে খাবারের খোঁজ লাগাই।  ওরা জানালো খাবার হোটেল সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বাইরে বের হয়ে ঠিক তাই দেখলাম।

 খুঁজে খুঁজে যাও একটা হালাল রেস্টুরেন্ট খোলা পেলাম সেটিও বন্ধ হয় হয় অবস্থা। হোটেলের লোকজন মনে হয় আমাদের দেখে কিছুটা অবাক হলো। আমাদের ভাবভঙ্গি দেখে খাওয়াতেও রাজি হলো।

কিন্তুু  গোল বাঁধল অন্য জায়গায়Ñভাষা সংকট, আমরা ওদের কথা বুঝি না, ওরা আমাদের কথা বোঝে না। বাংলার আশা করে লাভ হবে না, তাতো জানি, তাই দ্বারস্থ হলাম আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির। না কোনো লাভ নেই। শুরু হলো আকার ইঙ্গিতে ভাবপ্রকাশের চেষ্টা।

বুঝতে পারলাম, ভাষা আবিষ্কারের পূর্বে আদিম মানুষের কত কষ্ট হয়েছিল।

উহু! কোনো কাজ হচ্ছে না, হাত-পা নেড়ে মুখভঙ্গি করে বোঝানোর চেষ্টা করতেই লাগলাম। এই প্রথম নিজেকে অসহায় লাগছিল খুব।

কী বিড়ম্বনা। খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি নতুন এক চিত্র। গোল টেবিলের মাঝখানে ইলেকট্রনিক চুলা। তাতে একটা পাত্র বসিয়ে দেওয়া হলো। দিল পানি সাথে কিছু মসলা। আর চার পাশে সাজিয়ে দিল কাচা সবজি, নুডলস ও গরুর পাতলা পাতলা মাংস। ইশারায় বললোঃ ফুটিয়ে খেতে, আর সাথে দিল বাটিতে করে ভাত।

এই খাবারের সাথে আমার আগে একবার পরিচয় হয়েছিল মিয়ানমারে। নাম হটপট। মানে নিজে রান্না কর, নিজে গরম গরম খাও। খেতে ভালো। এখন এটা আমার পচ্ছন্দের একটা খাবার হয়ে গেছে।

স্থানীয় এক মাছের বাজার। ছবি : লেখক

আমার স্বামী মারুফ আমাদের নিয়ে আসার আগে  ১৪ দিন চীন থেকে গেছে। আর এই সুযোগে বাসাও ঠিক করে গেছে। যেখানে বাসা নিয়েছে সটা খুবই সুন্দর এলাকা।  কিন্তু আমার বাসা তেমন পচ্ছন্দ হয়নি। কারণ চুলার ব্যবস্থা নেই।  ইলেকট্রনিক চুলা ব্যবহার করতে হবে আর যার সাথে আমার আগে কখনো পরিচয় হয়নি। 

বাসায় গ্যাস নেই। এখন বাসা পাল্টানোও যাবে না। কারন কন্টাক্ট সেভাবেই করা।  ঘরের জন্য জিনিসপত্র কিনতে হবে। গেলাম শপিং। আমার স্বামীর এক চীনা কলিগ ছিল তিনি আমাদের সাহায্য করেন।  ওর নাম হাই তাও, আর ইংলিশ নাম পিটার। খুবই ভালো ছেলে। গেলাম শপিং সেন্টার ।

গিয়ে মাথা খারাপ অবস্থা। অনেক জিনিস। কিন্তু দাম আকাশছোয়া। এক দোকানে সবকিছু। বুঝলাম সস্তা চাইনিজ বলে আমরা যে মজা করি তা বাংলাদেশের জন্য সত্য। কিন্তুু বাস্তবতা এখানে উলটো। এখানে দাম যেমন মানও তেমন।

ইনডাকশন চুলা তো কিনলাম কিন্তুু ব্যবহার করবো কি করে এর উপর যে নিদর্শনাবলী দেওয়া আছে তা সব চাইনিজ ভাষায়। বাংলাদেশি আমরাতো হারতে পারি না। শুরু করলাম গুতোগুতি।

হাই থাও আমাদের সঙ্গে তিন মাসের মতো ছিল। আমাদের সাহায্য করার জন্য। । ছেলেটা অত্যন্ত ভদ্র। সবচেয়ে মজার বিষয় যা রান্না করতাম চেটেপুটে খেয়ে ফেলতো। বলতো সে এসব খাবার খুব পচ্ছন্দ করছে।

এদের সেলুনগুলো খুব মজার। ছেলে বা মেয়ে়দের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা নেই। এক জায়গাতেই সবাই চুল কাটে। আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছেÑ চুল কাটার আগে শ্যাম্পু করে পরিষ্কার করা হয়। তারপর চুল কাটা হয়। শেষে আবার শ্যাম্পু।

এখানে বিভিন্নœ ধরনের বাড়ি আছে। ভাড়া নিতে চাইলে সেসব বাড়ি  ভাড়া নিতে হবে ব্রোকারের মাধ্যমে। এদের আলাদা অফিস আছে। যেখানে ওরা বাসা ভাড়া ও বেচাকেনার কাজটি সারে। এটাই ওদের ব্যবসা।  যার বিনিময়ে তারা পায় ৩০% কমিশন।

 ভাড়াটেরা কী রকম বাসা চান এবং কোন এলাকায় বাসা চান, সেটি ওদের জানালে বাকি কাজ ওরা করে। আপনি ওদের সাথে গিয়ে, আপনার আয়, রুচি ও পচ্ছন্দ মতো বাসা বেছে নিবেন।

মজার বিষয় হচ্ছে, এদের বাসার আসবাবপত্র সাজানোই থাকে। তবে আপনার ইচ্ছে হলে ওদের আসবাবপত্র ফেলে দিয়ে নিজের পচ্ছন্দ মতো কিনে নিতে পারেন । কিন্তু  যদি বাসা ছেড়ে  দেন তখন কিন্তু আপনার কেনা আসবাবপত্র সাথে নিয়ে যেত পারবেন না।  কারণ, আপনি বাড়ির মালিকের আসবাবপত্র ফেলে দিয়ে সেখানে নতুনটা ঢুকিয়েছেন। তাই এখন এসব আসবাবপত্র বাড়িওয়ালার হয়ে যাবে।

নতুন বাসাতে উঠার সময় যা কিনতে হলো তা হলো:  বিছানাপত্র  মানে লেপ, তোষক, বালিশ, বিছানার চাদও, আর রান্না করে খাওয়ার জন্য হাড়িপাতিল ইত্যাদি। টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এসি, খাট, আলমারি সবাই আছে।

এখানকার বাড়িগুলোর সিস্টেম হচ্ছে একটি এলাকায়  যত বাড়ি হবে তাদের উচ্চতা, আকার, রঙ একই হবে। ভবনের দূরত্ব সমান হবে। পর্যাপ্ত আলো বাতাস ঢোকার জন্য এই ব্যবস্থা।

আর একটি মজার বিষয় হচ্ছে ৬ তলা ভবনে কোনো লিফট নেই। তবে ভবনের উচ্চতা এর চেয়ে বেশি হলে তখন লিফটের ব্যবস্থা করা হয়। আমি প্রথম যে বাসাতে উঠেছিলাম তা ছিল ডুপ্লেক্স এরাকায়। এখানে সব বাড়ি দেখতে একই রকম এবং প্রত্যকটি বাড়ি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। সবজি, ও ফলমূলের গাছ লাগায় বাসিন্দারা।

প্রত্যেকটি বাগানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই সুন্দর। রাস্তাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং একজন পরিচ্ছনন্তাকর্মী সর্বক্ষণ পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত। বাগানগুলো সর্বক্ষণ সিসিটিভি দিয়ে  গার্ড রুম থেকে মনিটরিং হচ্ছে। গাড়ি প্রবেশ ও বের হওয়া  মনিটরিং হচ্ছে।

বাচ্চাদের খেলার পার্কও আছে। রয়েছে বয়স্কদের জন্য শরীর চর্চার ব্যবস্থা । প্রতিটি বাগানের পাশেই সুন্দর লেক। ঝকঝকে পানি। মাছেরা ভেসে বেড়ায় সেখানে।

লেখক: ডালিয়া মজুমদার। সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে মন্তব্য করুন :