ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি?

ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি?

মনে করুন, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে আরাম করে ঘুমুতে এসেছেন, ডিমলাইট জ্বেলে / বাতি নিভিয়ে, কোল বালিশ জড়িয়ে চোখের পাতা বুজলেন, আরামদায়ক আলস্য ছড়িয়ে ঘুম নেমে এসেছে- তখন হঠাৎ মনে হল, উঁচু পাহাড় কিংবা বহুতল ভবন থেকে পড়ে যাচ্ছেন আপনি।

অথবা অফিসে কাজের ফাঁকে ডেস্কে মাথা রেখেই একটু মিনিট কয়েক ঝিমিয়ে নিচ্ছেন, চোখ বুজে এসেছে , হঠাৎ ধড়ফড় করে জেগে উঠলেন। শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুমটাই ভেঙ্গে গেলো। কারণ আপনার মনে হচ্ছে , বিমান/ সিঁড়ির উঁচু ধাপ/ উপর থেকে গড়িয়ে পড়ছেন আপনি।

চলন্ত বাসে ঘুমিয়ে আছেন, হঠাৎমনে হলো, কেউ ধাক্কা দিয়ে উঁচু থেকে ফেলে দিয়েছে আপনাকে।

ছবি : ইন্টারনেট

বই পড়তে পড়তে ঘুমে চোখ বুজে এসেছে হঠাৎ মনে হলো কেউ ধাক্কা দিয়ে ঝপ করে পানিতে/ নদী/ পুকুরে ফেলে দিয়েছে। আসলে হাত থেকে বই পড়ে গেছে আর আপনি হুট করে জেগে উঠেছেন।
এরকম অনুভূতিগুলো আমাদের মাঝেমাঝেই হয়ে থাকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঝাঁকুনিকে বলা হয় হিপনিক জার্ক (Hypnic jerk)। এরকম হলে সাধারণত অনেক উঁচু কোন জায়গা থেকে পড়ে যাওয়ার একটা অনুভূতি হয়, হার্টবিট বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, কখনো কখনো ঘাম হতে পারে। কখনো কখনো এই ঝাঁকুনিকে ছোটখাটো ইলেকট্রিক শকের মত লাগে কিংবা মনে হয় কেউ থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দিয়েছে ।

এই ঝাঁকুনির অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। যেমন- স্লিপ স্টার্ট (Sleep Start), মাইওক্লোনিক জার্ক (Myoclonic Jerk), হিপ্নাগোগিক জার্ক (Hypnagogic Jerk) প্রভৃতি।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ঝাঁকুনির সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই এমনকি ব্যাখ্যা নেই। ঘুম আসা ও ঘুমিয়ে পড়ার সন্ধিক্ষণে হঠাৎ শরীরে ঝাঁকুনি অনুভূত হয়৷ ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলেরই এই ঘটনা ঘটে থাকে৷ তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে , হিপনিক জার্ক আসলে কোনও রোগই নয়৷ শরীরের জন্য ক্ষতিকর কিছুও নয়।

নির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও হিপনিক জার্ক হওয়ার পেছনে কিছু কিছু ব্যাপার কে দায়ী মনে করা হয়। যেমন-

• অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যাফেইন বা চা-কফি জাতীয় পানীয় গ্রহণ।

• অতিমাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম/ ব্যায়াম।

• কর্মক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত জীবনের অতিরিক্ত চাপ মাথায় নিয়ে ঘুমোতে গেলেও এমন ঘটনা ঘটে৷ অতিরিক্ত উত্তেজনার জন্য ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে৷ ফলে চিন্তায় ঘুম ভেঙে যায়৷

• রাত জেগে টিভি দেখা বা মোবাইল ফোন ব্যবহার অথবা ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর ফলে স্নায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তনে শরীরে ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে নারকোলেস্পি বলে।

• রোজ ঘুমানোর সময়ের অনিয়ম বা রাত জাগার বদভ্যাস, অতিরিক্ত খাঁটুনী/ ক্লান্তি এই সমস্যাগুলো থেকেও হিপনিক জার্ক হতে পারে।

• অনেক সময় মদ্যপান করে ঘুমোলেও এমনটা হতে পারে।

• অনেক সময় শরীরের কোনো স্থান, বিশেষ করে পা, একভাবে দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের ফলে শরীরের মাংসপেশীতে ঝিঁঝি ধরে যেতে পারে। এই অবস্থায়ও হিপনিক জার্ক হতে পারে।

• শরীরে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও আয়রনের অভাবেও স্বতঃস্ফূর্ত হিপনিক জার্ক হতে পারে।

• এছাড়া বাইরের জোরে কোনো শব্দ ও চড়া আলো চোখে এসে পড়লেও আমাদের পড়ে যাওয়ার অনুভূতি টের হতে পারে।

ছবি : ইন্টারনেট

হিপনিক জার্ক কোনো অসুখ না হলেও মাঝে মাঝে তা বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এ থেকে মুক্তি পেতে আমরা কতগুলো অভ্যাস তৈরি করার চেষ্টা করতে পারি।যেমন-

১- প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, কমপক্ষে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো।

২- ঘুমের জন্য আলো নিভিয়ে, চারপাশের শব্দ কমিয়ে চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরি করা।

৩- ঘুমানোর ঘুমের আগে চা-কফি বা যেকোনো ক্যাফেইন জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ না করা।

৪- রাতে ব্যায়াম, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম না করা।

৫- মস্তিষ্ককে বেশি উত্তেজিত করে এমন কাজ পরিহার করা।

হিপনিক জার্ক বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও কারোক্ষেত্রে যদি তা অতি মাত্রায় হতে থাকে তাহলে তার চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত মাত্রার ওষুধ গ্রহণ ভালো ঘুম হতে এবং হিপনিক জার্ক কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তথ‌্যসূত্র : ইন্টারনেট

লেখক : কাজী তাহমিনা, লেখক ও শিক্ষক ( ইংরেজি বিভাগ) ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :