খেয়ালী গানের পাখি লাকি আলি

খেয়ালী গানের পাখি লাকি আলি

লাকি আলি। ছবি : ইন্ডিয়া টাইমস

লাকি আলিকে শহরের নি:সঙ্গ পাখির মতো মনে হয়। যে নিজের খেয়ালে গান গায়। আবার যখন খুশি গান থামিয়ে উড়ে যায় দূরে কোথাও।

ভারতের সঙ্গীত ভূবনে হঠাৎ আবির্ভাব লাকি আলীর। হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার মতো যিনি সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। শ্রোতাদের মোহাচ্ছন্ন রেখেই একদিন তিনি চলে যান জনপ্রিয়তার মঞ্চ ছেড়ে।

শ্রোতারা ভীষণ মিস করতে থাকে লাকির সুরেলা কণ্ঠের ভিন্ন গায়কীর গান। যেগুলো ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে প্রোথিত। আবেগ, ভালোবাসা ও  মানবীয় অনুভূতি কন্ঠে ধারণা করা বেশ কঠিন। লাকি সেই কাজটি করেছেন প্রতিনিয়ত। সাদামাটা ব্যালাড স্টাইলের গানগুলো শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়। তার ঝাঁকড়া কোকড়া কাঁচা পাকা চুল, বড় বড় চোখ ও ভূবন ভোলানো হাসিও আকৃষ্ট করে দর্শক-শ্রোতাদের।

গান গাওয়ার জন্য কোনো প্রস্তুতি নিয়ে আসেননি। অবশ্য তার যে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সেখানে এই সুুযোগ কোনো ব্যাপারই ছিল না। গান শিখতে ওস্তাদের কাছে যাননি। যে গিটার বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেন শ্রোতাদের, তাও শিখেছেন নিজে নিজে টুংটাং করতে করতে।

প্রথম এলবাম সুনহ’র মাধ্যমে অভিষেক ঘটে বণার্ঢ্য ক্যারিয়ারের। এই এলবামের কারণে ১৯৯৬ সালে সেরা পুরুষ পপ তারকার পুরস্কার লাভ করেন। ষাট সপ্তাহ এমটিভি এশিয়া চার্টে ছিল এলবামটি।  কেউ কেউ মনে করেন, এই এলবাম ইনিডয়ান পপ গানের মধ্যে সবচেয়ে সেরা। পরবর্তী এলবাম সিফার, সুনহ’র মতো ততো সাফল্য পায়নি। কিন্তু এলবামে তার খসখসে কন্ঠ, গানের কথা ও সুর  শ্রোতাদের মনে দাগ কাটে।

জীবনকে আবিষ্কারের নেশা তাকে তাড়া করে। ছবি: দ্য হিন্দু

একসময় গান গাইতে ভালো লাগেনি, নিজেকে সেখান থেকে গুটিয়ে নেন অন্যকোনো অভিযাত্রায় ছোটার জন্য। তাই জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র ভূমিকায় দেখা মেলে লাকি আলির।

সেই অভিযাত্রার পথটাও বর্ণিল ও বহুমুখী। তাকে দেখা যায়  ঘোড়ার খামারে। ঘোড়ার বাচ্চার পরিচর্যা করে বেড়াচ্ছেন। আবার কখনো উট পাখি ও ইমু লালনপালন করছেন।

এসবে একঘেয়েমি চলে আসলে তিনি চলে যান দক্ষিণ ভারতের প-িচেরিতে।  সমুদ্র তীরে তেলের খনিতেও কাজ করতে দেখা যায় তাকে।

মন যার উদাসী হাওয়ার মতো এলোমেলো, সে কী করে এক কাজে দীর্ঘদিন মনোনিবেশ করেন? একসময় শুরু করে দিলেন কৃষিকাজ। এবার তিনি পুরোদস্তুর কৃষক। নিরাপদ বিষমুক্ত ফসল ফলান তিনি। অর্গানিক কৃষি পদ্ধতিতে কৃষকের আগ্রহ সৃষ্টিতে কাজ শুরু করেন।

তাকে ভারতে ‘এগ্রিটেকচার’ কৃষি পদ্ধতির প্রবক্তা বলেন কেউ কেউ। যেহেতু কৃষিজমি কমে আসছে, কিন্তু খাদ্য শসের‌্য উৎপাদন বজায় রাখতে হবে আগের মতো, সে ক্ষেত্রে অল্পজমিতে কীভাবে বেশি ফসল ফলানো যায় তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। মাঝে তাকে দেখা গেছে ডায়াবেটিস নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারপ্রচারণা চালাচ্ছেন।

লাকি আলির জন্ম ১৯৫৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে।  বাবা ও মা দুজনই বিখ্যাত। ভারতের ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রির জনপ্রিয় কমেডিয়ান, গীতিকার ও সুরকার মেহমুদ আলির দ্বিতীয় সন্তান লাকি আলি।

মা মাহেলাকার রক্তে বাংলা ও পাঞ্জাবের রক্ত ছিল। ’৬০ এর দশকের বিখ্যাত অভিনেত্রী মিনা কুমারীর বোন তিনি। বলিউড অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পি মিনু মমতাজ ছিলেন লাকির ফুপু।

লাকি আলি ও  তার বাবার মধ্যে সম্পর্কটা আর আট দশটা পিতা-পুত্রের মতো স্বাভাবিক ছিল না। মেহমুদ ছিলেন ব্যস্ত অভিনেতা। সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তাকে ঘুরে বেড়াতে হতো ভারতজুড়ে। খুব বেশি থাকতে পারতেন না নিজের পরিবারের সঙ্গে।

তাই লাকি আলির সঙ্গে সেই অর্থে মানসিক সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। লাকির বয়স তখন পাঁচ বছর। মায়ের সঙ্গে গেল বিমানবন্দরে। বাবা কোথা থেকে যেন অভিনয় করে ফিরছেন। তাকে রিসিভ করতে হবে।  লাকিতো বাবাকে অনেকদিন দেখেনি, তাই চেহারা মনেও নেই। বাবাকে দেখে বললো, মা! মা! দেখ, দেখ অভিনেতা মেহমুদ আমাদের সামনে!

ওদিকে লাকি আলির দুরন্তপনার কারণে বাবা-মা ভাবলেন, বাসায় সবার সঙ্গে থাকলে তার পড়াশোনা হবে না। ওকে নিরিবিলি পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

লাকি আলিকে ভর্তি করানো হলো মিসৌরিতে হিমালয়ের কাছে এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বোর্ডিং স্কুলে।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গানের মধ্যে থাকতে চান লাকি । ছবি : মুড সোয়াগ

শৈশবের এই নি:সঙ্গতা মনে হয় স্থায়ীভাবে জেঁকে বসে লাকি আলির মনের গহীনে। কৌতূহল নিবাড়ন নাকি নি:সঙ্গতা এড়ানো কে জানে লাকি পা রাখেন নেশার অন্ধকার জগতে। মারিজুয়ানায় আসক্ত হন তিনি।

ছেলের এ পতন ভাবায় মেহমুদকে। মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে দুশমান কি দুনিয়া নামে একটি সিনেমা বানাতে উদ্বুদ্ধ হন। সিনেমায় দেখা যায় লাকি নামে এক তরুণ কিভাবে মাদকাসক্ত হয়ে তার মাকে হত্যা করছে, আশপাশের মানুষের জীবনের শান্তি বিঘœ করছে, মানুষের জীবন ধ্বংস করে ফেলছে। সিনেমার একদম শেষে লাকি তার বাবাকে খুন করে। 

এই সিনেমায় মেহমুদ যেভাবে মাদক ও তরুণদেও ন্যারেটিভ উপস্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি লাকি আলি।  তাই অনুরোধ সত্ত্বেও লাকিকে সিনেমায় অভিনয় করাতে রাজি করাতে পারেননি মেহমুদ। 

লাকির জায়গায় অভিনয় করেছেন লাকি আলির ছোট ভাই। সিনেমায় শাহারুখ খান ও সালমান খান স্বল্পসময়ের জন্য হাজির হয়েছিলেন। তবে দুই খান মিলেও সিনেমাকে হিট করাতে পারেননি।

লাকি এর ব্যাখ্যা দেন এভাবে, আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পে কোনো আশার আলো দেখানো হয়নি। অভিনয় না করলেও আমার জীবনের প্রথম প্লেব্যাক সং করা হয় এই সিনেমায়।

সিনেমায় দ্বিতীয় গান করেন হৃতিক রোশনের প্রথম সিনেমা কাহো না পেয়ার হ্যায়-তে। ‘না তুম জানো না হাম’ ও ‘এক পালকে যিনা’ চারদিকে সাড়া ফেলে দেয়।

লাকি আলী বলেন, চলচ্চিত্র আমার অগ্রাধিকারের তালিকা নেই। আমাকে নিজেকে বরারবরই এই ইন্ড্রাস্ট্রিতে প্রান্তিক কিছু মনে হয়েছে। আমার সমস্ত অনুরাগ গানের প্রতি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও গানের মধ্যে থাকতে চাই। গান হলো মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগের একটি মাধ্যম।

বাবার প্রসঙ্গে বলেন, একইসঙ্গে একধরনের ভালোবাসা ও ঘৃণার সম্পর্কের মিশেল দেখি। তিনি চাইতেন যে আমি আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেড়ে উঠি। কিন্তু আমি ছিলাম কিছুটা বিদ্রোহী ধরেনর। তিনি চাইতেন জীবনের সব কটি দরজা খুলে আমাকে এর ভেতরে কী আছে দেখাতে। বাবার দেখানো পথে আমিও সেই দরজা খুলে ঢু মেরেছি। দেখেছি ভেতরে কী আছে। আমি কার্পেট পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে তেলের খনিতে কাজও করেছি। এসব দেখে মনে হয় তিনি খুশিই হয়েছেন।

তিনি আমাকে বলতেন, জীবনে যদি প্রয়োজন পড়ে রিকশাও চালাও,কিন্তু কারো কাছ থেকে সুযোগ নিও না। হাত পেত না। 

মাঝে ৫ বছর তিনি সঙ্গীত ভূবন থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি চেয়েছিলাম এই সিস্টেম থেকে কিছুদিন দূরে থাকতে। আমাদের মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রির লোকেরা অনেক বেশি ডিমান্ডিং। কিন্তু আমি নিজের মতো করে গান করেেত পছন্দ করি। যে গান ভালোবাসি, সেই গান গাই।

তথ্যসূত্র: লাস্ট ডট এফএম, দ্য হিন্দু, স্টারসাআনফোল্ডেড ডটকম ও ইফটিউব।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :