যেভাবে চাকরির পরীক্ষা নিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

যেভাবে চাকরির পরীক্ষা নিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই চাকরি পাওয়াটা বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে একদিকে যেমন চাকিরর ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসছে, তেমনি নিয়োগকর্তারা বলে আসছেন, আজকাল নাকি ভালো ছেলেপুলে আর তেমন একটা পাওয়া যায় না।

চাকরি না পেয়ে তরুণরা নিজের কপালের উপর দোষ চাপায়। পাশাপাশি নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক ব্যবস্থাকেও দায়ী করে। আসলে হতাশ তরুণরা অন্য কিছুর উপর দোষ চাপিয়ে ব্যর্থতার বোঝা হালকা করার চেষ্টা করেন।

আর তাদের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হলো: আরে, মামা চাচা না থাকলে কী আর চাকরি হয়?
এমন বাস্তবতায় চাকরি প্রত্যাশীদের কপালে আরো দুর্ভাবনার কালো মেঘ নিয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমতা বা আর্টিফিশায়াল ইন্টেলিজেন্স (এআাই)। মানুষের বদলে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া।

তাই নিয়োগকর্তাদের পক্ষে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের লোকজনকে কষ্ট করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে হাজার হাজার চাকরির আবেদন পড়ে দেখতে হবে না। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে হবে না কার কী শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অযোগ্যতা রয়েছে। কে কোন কোন বিষয়ে পারদর্শী বা কার কী কী সহশিক্ষা কার্যক্রমে দক্ষতা রয়েছে। তাদের হয়ে এখন কাজগুলো করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

শুধুু কী তাই? চাকরির পরীক্ষা, ভাইভাসহ প্রচলিত যে পদ্ধতি অনুসরণ করে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো, সেই পদ্ধতিও গায়েব হয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিক কোনো পরীক্ষা নেওয়া ছাড়াই বলে দিচ্ছে এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত, আর তিনি উপযুক্ত নন।

কয়েকদিন আগে বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, এক সাংবাদিক একটি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো তাকে সেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো অফিসে যেতে হয়নি। তিনি তার ঘরেই বসেই ওই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, অনলাইনে হয়েছিল পরীক্ষা।

পরীক্ষার প্রথম ধাপে তাকে সহজ কিছু অনলাইন গেইমে অংশ নিতে হয়েছিল। যেমন: দুটি বাক্সের ভেতরের ডটগুলো খুব দ্রুত গোনা, ফেটে যাওয়ার আগেই দ্রুত বলা কয়টা বেলুন ছিল। এয়াড়া তার আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে মুখেরভঙ্গি মিল আছে কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।

মোট কথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ওই সাংবাদিকের ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছিল। ওই নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না, যোগ্য বিবেচিত হয়ে তার চাকরি হওয়া অথবা অযোগ্য বিবেচিত হয়ে নিয়োগ থেকে ছিটকে পড়ার এই পুরো বিষয়টি নির্ভও করছিল একটি যান্ত্রিক পক্রিয়ার উপর।

এমন নয় যে, নিয়োগদাতারা বর্তমান সময়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, কয়েক বছর আগে থেকে দেখা যাচ্ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সীমিতমাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভরতা আরো বেড়েছে।

বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন কর্মীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল, তখন কর্মী নিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকতরা কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া শুরু করেন।

নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান হলো পাইমেট্রিক্স। তাদের সফটওয়্যারে এমনভাবে নির্দেশনা দেওয়া থাকে যে, চাকরিপ্রত্যাশীকে যে প্রশ্ন করা হয়, তার উত্তর শুনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার্থীর ব্যক্তিক্তের বহুমুখী ধরণ, তার বুদ্ধিমত্তা, ঝুঁকি সহ্যক্ষমতা এবং কত তাড়াতাড়ি একটি পরিস্থিতি তিনি সামলাতে পারেন সেই বিষয়টি পরিমাপ করতে পারে। মাত্র ২৫ মিনিটের কিছু প্রশ্নোত্তরের মধ্যে দিয়েই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি প্যাটার্ন জেনে নেয় ।

এই ধাপ পার হতে পারলে তার পরীক্ষা নিতে আসেন রক্তমাংসের মানুষেরা। বর্তমানে সারা বিশ্বের বেশকিছু নামিদামী প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপটি এমন সফটওয়্যারের সাহায্যে নিয়ে থাকে। সে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যাকডোনাল্ড, জেপি মরগ্যান ব্যাংক, হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি এবং খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠান ক্র্যাফট হেইনজ।

পাইমেটিক্সসের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডা পল্লি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদতে প্রতিষ্ঠানগুলোই লাভবান হয়। কারণ তারা একটি পূর্বধারণা লাভ করে যে কর্মীটি ভবিষ্যতে এসব কাজে পারদর্শীতা দেখাবে। আসলে নিয়োগকর্তা চান ভালো একজন কর্মী পেতে, অন্যদিকে নিয়োগপ্রার্থী চান তার পছন্দের কাজটি পেতে। কিন্তু এই দুটি বিষয়ের যদি সমন্বয় না হয় তাহলে আদতে কেউই লাভবান হয় না। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উভয়পক্ষের লাভবান হওয়ার একটি কার্যকর উপায়।

এমন আরেকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান হলো হায়ার ভিউই। প্রতিষ্ঠানটি চাকরিপ্রার্থীর যে সাক্ষাৎকার নেয় ল্যাপটপের ওয়েবক্যামের সাহায্যে এবং মাইক্রোফোনের মাধ্যমে তাদের কথোপকথনও রেকর্ড করা হয়। তারপর কথোপকথনের অডিও রেকর্ডটিকে রুপান্তর করা হয় লিখিত শব্দে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই লিখিত শব্দের মধ্য থেকে প্রধান বা কিওয়ার্ডগুলো বিশ্লেষণ করে। যেমন দেখা হয় সাক্ষাৎকারে টিমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনায় কতবার চাকরিপ্রার্থী ‘আমাদের’ এর পরিবর্তে আমি বলেছিল।

পাইমেট্রিক্সেও কর্মকর্তারা দাবি করেন, তাদের এই ব্যবস্থায় নিয়োগে অধিকতর স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র প্রার্থীর সিভির উপর নির্ভর করা হয়। কিন্তু একটি সিভির মাধ্যমে মোটাদাগের দক্ষতাগুলোর তথ্য থাকে। এর বাইরেও যে আরো কিছু বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জানতে পারা সম্ভব।
যদিও এই ধারণার সাথে একমত হতে পারেনি অ্যামাজন। রয়টার্সে এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সালে ওরা ওদের নিজস্ব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার কিছুটা সংশোধন করেছে। কারণ ওই প্রোগ্রামটি নারী চাকরিপ্রার্থীদের ব্যাপারে বিরুদ্ধ মনোভাব দেখাত।
তবে এ বিষয়ে বিশেজ্ঞদের অভিমত চাকরির নিয়োগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতার আগে এর পারদর্শীতা আরো বাড়াতে হবে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো প্রফেসর সান্ড্রা ওয়াচটের বলেন, আমি চিন্তিত হব যদি কেউ বলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের শুধু ভালো দিক আছে। কারণ যে কোনো মেশিন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোগত পদ্ধতিতে কাজ করে তাকে কিছ তথ্য দেওয়া হয়, সে একটি একটি প্যাটার্ন ও কিছু সামঞ্জস্য মেনে কাজ করে। তাই যেকোনো নিয়োগে সে আগের কোনো বিষয়ে সফল প্রার্থীকেই যোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করবে।


যা বোঝা যাচ্ছে, করোনাকালে শিল্প মালিকরা কীভাবে স্বল্প কর্মী দিয়ে কাজ চালানো যায় তার উপায় খুঁজেছে। এভাবে ছোট হয়ে এসেছে চাকরির বাজার। সেই ছোট চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে হলে প্রার্থীকে ডিঙ্গাতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কঠিন পরীক্ষা। মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে কী সেই পরীক্ষায় পাস করা?

লেখক: পলাশ সরকার।

এখানে মন্তব্য করুন :