কীটসের ‘ব্রাইট স্টার’ ফ্যানি ব্রোউন

কীটসের  ‘ব্রাইট স্টার’ ফ্যানি ব্রোউন

জন কীটস । ছবি : উইকিপিডিয়া

সাহিত্য অনুরাগীদের মধ্যে খুব কম জনকে পাওয়া যাবে যিনি জন কীটসের নাম শোনেননি। ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি তিনি। কীটস খুবই স্বল্প আয়ু পেয়েছিলেন, মাত্র ২৫ বছর।

কিন্তু তার এই ক্ষুদ্র জীবনের তিনটি বছর ছিল অত্যন্ত রঙিন, তীব্র প্রেম-ভালোবাসা ও আবেগে পূর্ণ। কটি দিন যিনি ভালোবাসার নানা রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন তার নাম ফ্যানি ব্রোউন।

এই ফ্যানি ব্রোউন কীটসের  ‘ব্রাইট স্টার’ হিসেবেই সাহিত্য অনুরাগীদের কাছে বেশি পরিচিত। তথাকথিত সুন্দরী ছিলেন না, ছিলেন সাদামাটা। তবে এই সাধারণের ভেতর অসাধারণত্ব খুঁজে নিয়েছিলেন কীটস।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, জন কীটস নারীদের উপস্থিতিতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। তিনি ভাবতেন নারীরা অবুঝ। তার কিছু চিঠি থেকে জানা যায়, তিনি পুরুষ সঙ্গে স্বাছন্দ্য বোধ করেন।

বন্ধু চার্লস ব্রাউনের বাড়িতে বেশ যাতায়াত ছিল জন কীটসের।  চার্লস একটি বড় অর্ধ-বিচ্ছিন্ন বাড়িতে থাকতেন, যেটি ওয়েন্টওয়র্থ প্লেস হিসেবে পরিচিত ছিল। বাড়িটির অবস্থান ছিল ইংল্যান্ডের হ্যাম্পস্টেডে।

জন কীটসের বাড়ি, এখনো বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন আসেন এখানে। ছবি: ট্রাভেল ডট আর্থ

চার্লস বাড়িটির অর্ধেকটা অংশ নিয়ে থাকতেন। তারই ভাগের একটা অংশ ফ্যানি ব্রোউনের পরিবারকে ভাড়া দিয়েছিলেন। আর বাড়ির বাকি অর্ধেক অংশ নিয়ে থাকত ডিল্ক পরিবার।

১৮১৮ সালের নভেম্বরে ফ্যানি ব্রোউন এবং জন কীটসের মধ্যে প্রথম দেখা হয়।

সেই ডিসেম্বর মাসেই কীটসের ছোট ভাই মারা যান।  মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কীটস। কীটস যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সেই সময়টায় ফ্যানি কীটসের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেন।

১৮১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর কীটস তার ভাই জর্জকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লেখেন। যেখানে তিনি ফ্যানিকে সুন্দরী, মার্জিত, সুরুচিসম্পন্ন নারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

কীটসের ভাই মারা যাওয়ার পর বন্ধু চার্লস তাকে নিজের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানান।

 ১৮১৯ সালের এপ্রিলে ডিল্ক পরিবার শহরে স্থানান্তর হওয়ার সিদ্ধানত নেয়। ওয়েন্টওয়র্থ প্লেসের তাদের ভাগটি ফ্যানি ব্রোউনের পরিবারকে ভাড়া দেন চার্লস। এখন ফ্যানি, কীটসের প্রতিবেশী যার সুবাদে তাদের আরো বেশি দেখা হতো।

শিল্পির তুলিতে ফ্যানি ব্রোউন । ছবি : ডেইলি মেইল

দুজন দুজনের প্রতি ভালোবাসায় আসক্ত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তারা দুজন একসাথে সাহিত্য চর্চা করতেন। ফ্যানির সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং কৌতুকপ্রিয় স্বভাব কীটসকে নতুন সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির প্রতি উৎসাহিত করে।

কীটস, ফ্যানিকে উদ্দেশ্য করে ‘ব্রাইট স্টার’ নামক কাব্য রচনা করেন। এই সময়ে কীটস তার জীবনের সেরা কিছু কবিতা রচনা করেন।

১৮১৯ সালের ১৮ অক্টোবর জন কীটস, ফ্যানি ব্রোউনের কাছে ভালোবাসার প্রস্তাব রাখেন, যা তিনি গ্রহণও করেন। তারা ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ আংটি বদলও করেন, যদিও তাদের জীবনের এই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা তারা গোপনে রাখেন।

ফ্যানির মা কখনো এই ঘটনা মেনে নিতেন না। কারন কীটস আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ছিলেন। সাহিত্যকর্মে নিযুক্ত হওয়ার আগে তিনি শৈল্যচিকিৎসক হওয়ার প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন। যদিও সেটা শুধুমাত্র সাহিত্যিক হওয়ার গভীর বাসনা থেকে পরবর্তীতে তিনি মাঝপথে ছেড়ে দেন।

ফলে তার ভবিষ্যৎ আর্থিকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং ফ্যানির মা কোনোভাবেই চাননি ফ্যানির বিয়ে এমন কারো সাথে হোক যিনি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল।

অন্যদিকে চার্লস তাদের এই সম্পর্কে খুশি ছিলেন না। ডিল্ক পরিবারের বন্ধু হওয়ার সুবাদে ফ্যানি প্রায়ই আর্মি অফিসারদের সঙ্গে পার্টিতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন (ডিল্ক নিজেও আর্মি অফিসার ছিলেন)।

চার্লস ভাবতেন ফ্যানি, কীটসের সাথে ছলনা করছেন। এই কারণে পরবর্তীতে কীটস তার সাহিত্যচর্চায় অমনোযোগী হয়ে পড়েন। যদিও পরবর্তীতে কীটসের শারীরিক অসুস্থতা তাদের সম্পর্কে গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কীটস লন্ডনে যান এবং ফিরে আসেন অসুস্থ শরীর নিয়ে। তার রক্তক্ষরণ হতে থাকে।  কীটসের পরিবারের অনেকেই যক্ষায় মারা যায়। তিনিও বুঝতে পারেন যম তাকেও গ্রাস করতে আসছে। ।

 তিনি ফ্যানিকে চিঠি লেখেন তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ফ্যানি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কীটসের শারীরিক অবস্থার কথা ভেবেই বন্ধুরা এবং ডাক্তার, ফ্যানিকে তার সঙ্গে দেখা করতে বারণ করেছিল।

কিন্তু সকলের বারণ সত্ত্বেও তিনি তার ভালোবাসার মানুষের সাথে দেখা করতেন এবং প্রায়ই চিঠি লিখতেন। পরবর্তীতে স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ডাক্তার কীটসকে ইতালি যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ তখন রোগীদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য কোনো  উষ্ণতর দেশে থাকার পরামর্শ দেওয়া হতো।

কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আর ফিরে আসেননি। ১৮২১ সালের ২৩  ফেব্রুয়ারি,  মাত্র ২৫ বছর বয়সে জীবনাবসন হয় কীটসের।  ইতালির রোমে মৃত্যুবরণ করেন।

ফ্যানির কাছে কীটসের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছায় এক মাস পর। এই মৃত্যু সংবাদের প্রভাব তার উপর পড়ে ভয়ানকভাবে। তিনি তার চুল কেটে ছোট করেন এবং কীটস তাকে যে আংটি দিয়েছিলো সেটি পুনরায় আঙুলে পড়েন।

পরবর্তী তিন বছর ফ্যানি বিধবাদের মত শুধু কালো পোশাক পরিধান করেন। তীব্র মৃত্যুশোক কাটাতে ছয় বছর লেগেছিল। ১৮৩৩ সালে কীটসের মৃত্যুর বারো বছর পর তিনি বিয়ে করেন । 

ফ্যানি ব্রোউনের সঙ্গে জন কীটসের জীবনের শেষ তিনটি বছরকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ব্রাইট স্টার নামে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০০৯ সালে ।

লেখক : ফ্লোরা মৃত্তিকা বিশ্বাস, শিক্ষার্থী, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :