কাঁটাতারের বেড়া

কাঁটাতারের বেড়া

দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কুলীন ব্রাহ্মণ সূর্যকান্ত আচার্য, তার চার পুরুষের ঠাকুর ঘর থেকে পূজা করে বের হলেন। তার পূর্ব পুরুষের তৈরি জমিদার বাড়ির উত্তর দিকে এই মন্দিরের অবস্থান। সূর্যকান্তের দিন শুরু হয় পূজার মধ্য দিয়ে।

সূর্য যখন পৃথিবীর বুকে উঁকি দিতে শুরু করে, রাতের অন্ধকার মিলিয়ে আকাশ জুড়ে দেখা দেয় হালকা গোলাপি আর ছাই রঙের রেখা, তখন  সূর্যকান্ত স্নান করে পূজায় বসেন স্ত্রী, কন্যা, পুত্রদের নিয়ে। তার পরিবারের জন্য এই পূজা বাধ্যতামূলক।

সুশীল শর্মা এই মন্দিরের পুরোহিত। মন্দির  তৈরির পর থেকে তারা বংশ পরম্পরায় এই মন্দিরের সেবক। মন্দিরের পেছনে তাদের আবাসস্থল। এক সময় পুরোহিত পরিবারও সকালের পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারত।

একটা বিশেষ ঘটনায় তারা এই মর্যাদা হারিয়েছে। এখন তারা বিশেষ বিশেষ  দিন পূজা করতে পারে। সেটাও সূর্যকান্ত পূজা শেষ কওে চলে যাবার পর।

ঘটনাটি সূর্যকান্তের স্ত্রী লিলির শোনা।  কারণ, ঘটনাটি ঘটেছে তার বিয়েরও আগে।

সুশীলের বোন সুকন্যা ছিল লিলির শ্বশুর বাড়ির সকলের খুব পছন্দের।  সূর্যকান্তের মায়ের নিজের কোনো মেয়ে ছিল না। বলতে গেলে সুকন্যা ছিল তার চোখের মণি। সুকন্যা নিজেও সুশীলা দেবীর সেবা করত নিজের মায়ের মতো। সুকন্যাকে নিজেদের করে রাখার জন্য একটি পরিকল্পনা করেন সুশীলা দেবী । পুরোহিতদের  সামাজিক অবস্থান ভালো হলে আর তাদের অন্নে পালিত না হলে তিনি সুকন্যাকে নিজের ছেলের বউ করে রাখতেন। তাই তার ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন সুকন্যার মায়ের কাছে। জমিদার বাড়ির আত্মীয়ের সাথে বিয়ে, এটি ছিল তাদের ভাবনারও বাইরে, অল্পদিনের মধ্যে বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য হয়ে গেল।

দুই বাড়িতে যখন বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল, তখন একদিন সুকন্যা হারিয়ে গেল। প্রথম দুই-এক দিন কোনো খবর পাওয়া গেল না সুকন্যার। পরে জানা গেল তার কলেজের এক বন্ধু, যে কিনা এক শূদ্রের ছেলে, তার জন্য ঘর ছেড়েছে  সুকন্যা।

পুরোহিতদের প্রতি আচরণ পাল্টে গেল সূর্যকান্ত আচার্যের, এতোদিনের সুসম্পর্কের অবসান হলো। শুরু হলো রাজা-প্রজার আচরণ।

অবস্থা আরো জটিল হলো যখন সুকন্যা ফিরে এলো সন্তানসম্ভবা বিধবা হয়ে। সূর্যকান্তের ইচ্ছে ছিল পুরোহিতদের  চাকরিচ্যুত করা। কিন্তু মায়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের আসা-যাওয়ার পথ আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে জমিদার বাড়িতে প্রবেশের। 

                    পূজা শেষ করে বের হবার সময় মেয়ে অর্যমার দিকে চোখ যায় সূর্যকান্তের। অর্যমা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, পড়াশোনায় মেধাবী, খুব ভালো নাচে। কি শুভ্র লাগছে অর্যমাকে, চোখ যেন ধাঁধিয়ে যায়, সূর্যকান্ত জানে সংসার কিংবা কর্মস্থল সব জায়গায় তার অবস্থান জ্বলজ্বল করবে, স্বার্থক হবে তার নামকরণ। বেশিক্ষণ কন্যার তাকিয়ে থাকতে পারে না। চোখ ফিরিয়ে নেয়। বাবা-মার চোখ নাকি বেশি লাগে সন্তানদেও উপর ।

                  অলস দুপুরে  সবাই যখন ভাত ঘুম দেয় অথবা বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খায়, অর্যমা তখন চলে যায় মন্দিরের পেছনে বাগানে। যেখানে পড়াশুনা করে সুশীলের বোনের ছেলে অয়ন। দুপুর থেকে আলো মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকে অয়ন। ওর অসম্ভব প্রিয় একটা জায়গা এটি। মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছে সে এবার। বসে কখনো পড়ার বই পড়ে, কখনো গল্পের বই পড়ে, আবার কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মাটির উপর পাতা চাদরে শুয়ে। অর্যমা সেই চাদরের উপর গিয়ে বসে।

প্রথম যেদিন অর্যমা এলো, অয়ন উঠে চলে গেল, আর এলো না। দিনের আলো শেষ হতে দেখে অর্যমা বাড়ি ফিরে গেলো। দ্বিতীয় দিনও অয়ন চলে গেল আর ফিরল না। তৃতীয় দিন অয়ন চলে গিয়ে ফিরে এলো কিছুক্ষণ পর। এরপর থেকে অয়ন আর চলে যায় না, তবে সে নিজের মতো করে থাকে। কোনো কথা বলে না অর্যমার সাথে।  অর্যমাও বই নিয়ে যেতে শুরু করল, দুজন মানুষ বই পড়ে আপন মনে। একদিন অর্যমা জিজ্ঞাসা করে:

–      তুমি আমাকে এভোয়েড করো কেন?

–      ছোট বেলায় মামা আমাকে বলেছিলেন তোমাদের বাড়ির আশেপাশেও না যেতে। তোমরা জমিদারদের  বংশধর তার উপর আমাদের মনিব।

–      একবিংশ শতাব্দীতে এগুলো কেউ মানে?

–      মা মারা যাবার পর সেই ছোটবেলা থেকে মামা-মামী আমাকে বড় করেছেন। তাদের আদেশ আমার কাছে শিরোধার্য।

–      তুমি তো যাওনি, আমি এসেছি, তবুও এতো দ্বিধা কিসের?

                কোনো উত্তর দেয় না অয়ন, মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে অর্যমার দিকে। অয়নের সামনে যে বসে আছে সে কী সত্যিই কোনো মানুষ, নাকি অন্য জগতের কেউ। মানুষ তো এতো সুন্দর হতে পারে না । এরপর থেকে অর্যমার দুপুর থেকে পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত সময় কাটে  অয়নের সঙ্গে।

পড়ন্ত বিকেলে অর্যমা যখন বাড়ির দিকে পা বাড়ায়, অয়ন তাকিয়ে থাকে ওর মন্দিরের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। দিনের আলো অন্ধকারে ডুব দেওয়া অবধি ঠায় বসে থাকে,  অর্যমার সাথে থাকার রেশ তখনো যেন তাকে ঘিরে  রাখে।

                  সূর্যকান্তের  বিকেলের চা এক জায়গায় বসে খেতে ইচ্ছে করে না। কখনো তার লাইব্রেরিতে, কখনো বাড়ির সামনের লনে, কখনো বারান্দায়  কখনো বা ছাদে। আজ তিনি দোতলার ছাদে বসে চা খাবেন। লিলির সাথে বিকেলের চা-নাস্তা খাওয়াটা ভীষণ উপভোগ করেন সূর্যকান্ত। লিলি নিজেও জানে সেটা, তাই তিনি নানা ধরনের নাস্তা বানান স্বামীর জন্য।

দুজনে মিলে ছাদের মাঝখানে বানানো পাকা গোল টেবিলে চা খাচ্ছিলেন। লিলির হঠাৎ চোখ পড়লো মন্দিরের পেছনে বাগানের দিকে। বাগানের মাঝখানে একটা চাদর পাতা, অর্যমা আর অয়ন দুজনে দুজনের পিঠে পিঠ লাগিয়ে বসে আছে। অয়নের হাতে বই, কিছু একটা পড়ছে। আর অর্যমা মাঝেমাঝে ঝর্ণার মতো হেসে উঠছে। অয়ন পকেট থেকে কি যেন বের করলো, পায়ে পরিয়ে দিচ্ছে অর্যমাকে। এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি প্রেমের দৃশ্য হতে পারত, কিন্তু সূর্যকান্তের দিকে তাকাতেই একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল মেরুদন্ড বেয়ে।

     -কি হয়েছে লিলি? শরীর খারাপ লাগছে?

     – না, আমি ঠিক আছি।

সূর্যকান্ত পেছনে তাকান। যা দেখলেন তাতে তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। দপদপ করে উঠে মাথার শিরাগুলো।

সূর্যকান্তের  রুদ্রমূর্তি দেখে  লিলি বলে:

      -অয়ন খুব ভালো ছেলে। ঢাকা মেডিকেলে পড়ে।

      -তুমি ভুলে যেও না লিলি, অয়ন সুকন্যার ছেলে, যার শরীরে বইছে শূদ্রের রক্ত। আমি আমার রক্ত দূষিত হতে দেব না!

                  সন্ধ্যায় মেয়ের কাছে গেলেন সূর্যকান্ত। জানতে চাইলেন বাগানের পেছনে কী করছিল অর্যমা। তিনি অবাক হলেন, মেয়ের জবাব শুনে। তিনি ভেবেছিলেন, অর্যমা ভয় পাবে, অস্বীকার করবে সবকিছু। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটল না। খুব স্বাভাবিক স্বরে অর্যমা  বলল:

–      আমরা বই পড়ি বাবা, কখনো পড়ার, কখনো গল্পের। তুমি আমাকে মিথ্যা বলতে শেখাওনি, বাবা। অয়নের সাথে আমার সম্পর্ক জানতে চাইলে বলব, আগে আমরা বন্ধু ছিলাম, কিন্তু আমার মনে হয় এখন সম্পর্কটা তার চাইতে বেশিকিছু।

                   অর্যমার চলাফেরা থেকে শুরু করে সবকিছুর উপর নিষেধাজ্ঞা  জারি হলো। কলেজ যায় বাবার সাথে। সূর্যকান্ত জানতেও পারল না তার সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা, দুজন মানুষের অব্যক্ত ভালোবাসার স্বীকৃতি পেয়ে গেল অগোচরে। অর্যমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হলো। পরীক্ষার গ্যাপ থাকলে সূর্যকান্ত বাড়ি থেকে কোথাও যায়। এই সুযোগে একদিন বিকেলে বাগানের পেছনে যায় অর্যমা। প্রায় দুই মাস পর অয়নকে দেখলো অর্যমা, কেমন মলিন চেহারা হয়েছে তার। অর্যমাকে দেখে চোখে আনন্দের ঢেউ খেলে যায় অয়নের।

–      একি অবস্থা তোমার?

–      আমি ঠিক আছি? তোমার অবস্থা কেন? তুমি আমার কাছে বাগানের সবচেয়ে সিন্ধ ফুল। 

–      আমাদের সাথে কী ঘটতে যাচ্ছে আমি জানি না, তবে যাই হোক তুমি পড়াশোনা করবে মন দিয়ে। চেষ্টা করবে ভালো থাকার, আমিও চেষ্টা করব ঠিক থাকতে। আর আমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে।

           অর্যমার হাতে হাত রাখে অয়ন। কোনো কথা না বলে, হাতটা ধরে রাখে শক্ত করে। তবে এই নৈশঃব্দের মধ্যে বলা হয়ে যায় অনেক অনেক না বলা কথা। 

কাউকে কিছু জানান না দিয়ে একদিন সূর্যকান্ত পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথায় যেন চলে যান।

তারও অনেক দিন পর, একদিন সকালে আচার্য ম্যানসনের বুড়ো দারোয়ান আসে পুরোহিত সুশীলের কাছে। হাতে সুশীলের নামে একটা চিঠি । তাতে সূর্যকান্তের দেওয়া একটি একাউন্ট নাম্বার। যেখান থেকে সুশীল আর বুড়ো দারোয়ান তাদের বেতন তুলবে।

 সুশীলের উপর মন্দিরের ভার আর দারোয়ান দেখে রাখবে তাদের পূর্বপুরুষের জমিদার বাড়ি। অয়ন সূর্যকান্তের সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান সব জায়গায় গেল, সব কিছুই বিক্রি করে দিয়েছেন সূর্যকান্ত। শেষ আশা নিয়ে গেল ব্যংকে, যেখান থেকে তার মামা বেতন তুলবেন।

অয়ন ভেবেছিল যে ভাবেই হোক ব্যাংক থেকে একটা হদিস পাবে অর্যমাদের। কয়েক দিনের উৎকন্ঠা আর চেষ্টার অবসান হলো যখন জানতে পারলো ব্যাংকে প্রচুর টাকা রাখা আর তার মামা আর দারোয়ানের বেতন সেখান থেকেই যাবে। কোথায় গেল আর্যমারাা? বাড়ির চারজন মানুষ যেন কর্পূরের মতো উবে গেল নাকি এটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল,যেখান থেকে শুধু মানুষগুলো উবে যায় আর বাকি সবকিছু থেকে যায় আগের মতো।   

                    চার বছর পর।

                    কোলকাতার সল্টলেকের একটা হাসপাতাল। বাংলাদেশের ডাক্তার আকাশ তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে থার্ড অপিনিয়নের জন্য। খুব তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে যেতে হবে আকাশকে। একজন ডাক্তার হিসেবে বুঝতে পারছেন পৃথিবী একটা দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাবে। কারণ গত দুই-তিন মাস ধরে  যে রোগটা চীনের  হুবেই প্রদেশের উহান শহর হতে ইউরোপ-আমেরিকায় তান্ডব চালাচ্ছে, তা এদিকে আসাটা সময়ের ব্যবপার মাত্র।

কোভিড-১৯ কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে তা এখন বোঝা সম্ভব নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় লকডাউন শুরু হয়ে গেছে, বাংলাদেশ কিংবা ইন্ডিয়ায় সব বন্ধ হবার আগেই দেশে ফিরতে হবে।

 এরই মধ্যে একদিন একটা ছেলে শশীকান্ত, খুব বাজে ভাবে একসিডেন্ট করে  আকাশদের হাসপাতালে এলো। রেয়ার গ্রুপের রক্ত, ও নেগেটিভ, না পেয়ে ছেলেটির বাবা যখন হাসপাতাল মাথায় তুলে ফেলেছেন, আকাশ নিজে গিয়ে রক্ত দিতে চাইলো।

রক্ত নিয়ে অপারেশন কার হলো, ছেলেটা মনে হয় এযাত্রা বেঁচে গেল। আকাশের আশংকাই ঠিক হলো, ওদের টিকিট কাটার আগেই বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ায় লকডাউন শুরু হয়ে গেল। হাসপাতালের কাজ শেষ হলে কোন হোটেলে উঠবে শুনে শশীকান্তের বাবা আকাশের আপত্তি কানে না তুলে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। দুদিন হয়ে গেল আকাশরা এবাড়িতে  এসেছে।

ওরা মুসলিম হবার কারণে ওদের খাবার ঘরে দিয়ে যায় কাজের লোক। শশীকান্তের মা প্রতিবেলা  এসে খবর নিয়ে যায়। দোতলা বিশাল একটা বাড়ি, মাঝখানে উঠোন, সেখানে তুলশি গাছ,চারধারে  বারান্দা । বেশ বনেদি পরিবার এরা, বুঝতে পারে আকাশ।

আকাশদের খাবার দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের ঘরের উল্টো দিকের ঘরেও খাবার দিয়ে যায় কাজের লোক। কে থাকে ওখানে? ওদের মতো আরো কোন মুসলিম পরিবার নাকি? কিন্তু এতো কিছু ভাবার সময় নেই আকাশের। প্রতিদিন দৌঁড়াদৌড়ি করছে দূতাবাসে। কবে ফিরতে পারবে দেশে ।

জীবনে এতোটা অসহায় অবস্থায় সে কখনোই পড়েনি। সপ্তাহ খানেক পর এম্ব্যাসি  থেকে একটা ফর্ম দিলো যেটা পূরণ করে জমা দিতে হবে। দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে সবার ফর্ম জমা পড়লে কতজন এদেশে আটকা পড়েছে তা দেশে জানিয়ে তাদের ফেরানোর ব্যবস্থা করবে। এরজন্য যেখানে সে অবস্থান করছে তার পুরো ঠিকানা লাগবে। আকাশ দেখা করতে গেল শশীকান্তের বাবার সাথে।

     -কাকবাবু আপনার নাম ,ঠিকানার ডিটেল্স লাগবে আমার ফর্মের জন্য।

    – সূর্যকান্ত আচার্য, ঠিকানা আচার্য ম্যানসন, পোস্ট অফিস রোড, নিউমার্কেট …..

                  আকাশ বাকি কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল না। ওর কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। ইনিই কি সেই সূর্যকান্ত আচার্য, যাকে সে অনেক খুঁজেছিল অনেক দিন ধরে।

–      আপনি সূর্যকান্ত আচার্য, পৌত্রিক বাড়ি পুরানো ঢাকার জমিদার বাড়ি আচার্য ম্যানসন?

–      হ্যা,

–      আপনাদের বাড়ির সামনে বিরাট পুকুর আর পেছনে মন্দির, যার পুরোহিত সুশীল শর্মা।

–      তুমি কিভাবে এতো কথা জানলে? কে তুমি?

      আকাশের মনে হচ্ছিল অনেক দিন ধরে ট্রেজার হান্ট করতে করতে এখন শেষ বেলায় এসে সেই খাজানার সামনে দাড়ানো। প্রচন্ড উত্তেজনায় কাঁপছে আকাশ।

       -অর্যমা কোথায় কাকাবাবু? কদিন দিন ধরে আপনার বাসায় আছি, কিন্তু ওকে তো দেখলাম না। অর্যমার কি বিয়ে হয়ে গেছে? নাকি ও আর …. 

        – অর্যমার বিয়ে হয়নি। আর ও এই বাড়িতেই আছে।বল্লে নাতো এতো কিছু কিভাবে জানো?

       – ‘প্রায় বছর চারেক আগের কথা। আমি তখন ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র। একদিন আমার এক স্যার আমাকে ডেকে আমার এক জুনিয়র অয়নের খোঁজ করলেন। অয়ন আমার ডিবেট ক্লাবের সদস্য ছিল। অয়ন প্রথম বর্ষে দারুন রেজাল্ট করলেও আর ক্লাসে আসত না। ওর মোবাইলে ফোন দিলাম, ফোন বন্ধ। ক্লাসমেটরা তেমন কিছু বলতে পারল না।’

‘অফিস থেকে ঠিকানা নিয়ে গেলাম, সেটা ছিল আচার্য ম্যানসন। অয়নের ঘরে ঢুকে দেখি, অন্ধকার কিছু দেখা যায় না । অন্ধকার হাতরে একটা জানানলা খুলি। ওখানে আমি যাকে দেখি সে অয়ন ছিল না, ছিল ওর কংকাল। আপনারা বাতাসে মিলিয়ে যাবার পর, আপনাদের খোঁজ পাওয়ার সমস্ত রাস্তা যখন শেষ হয়ে গেল, তখন সে নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে ফেললো। প্রথম দিন আমার সাথে কোন কথা বলল না।’

 ‘আমি রোজ যেতে লাগলাম। ধীরে ধীরে সে আমার সাথে কথা বললো। পুরোটাই অর্যমাকে নিয়ে। সময়ের সাথে সাথে ওকে বোঝালাম অয়নকে ভালো ডাক্তার হতে হবে। যেদিন অর্যমা ফিরে আসবে, তার উপযুক্ত হয়ে থাকতে হবে তো।’

‘কেন জানি না আমাকে বিশ্বাস করল, কলেজ যাওয়া শুরু করল। আমাকে মাঝেমাঝেই জিজ্ঞাসা করতো অর্যমা সত্যিই ফিরে আসবে তো। এরপর আমিও আপনাদের হন্যে হয়ে খুঁজেছি, সত্যিই আপনারা যেন বাতাসেই মিলিয়ে গিয়েছিলেন।’

 – কি লাভ হলো আকাশ? সেই তো তুমি পৌঁছে গেলে। আমি আমার শেকড় উপড়ে চলে এলাম, কোন কিছুরই অস্বিত্ব রাখলাম না, তারপরও সেই অতীত আমার পিছু ছাড়ল না। আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে কোলকাতায় চলে এলাম। ভেবেছিলাম সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।

অর্যমার রেজাল্ট বের হবার পর ওকে বলেছিলাম: জীবন কীভাবে গড়বে তোমার উপর নির্ভর করছে। তুমি ফেলে আসা অতীতকে বর্তমানে না আনলে তুমি যেখানে খুশি পড়াশুনা করতে পার। চাইলে ইউরোপের কোন দেশেও যেতে পার। আর তা না হলে তোমার ঘর হবে তোমার পৃথিবী।

                 সেদিন অর্যমা কোন উত্তর দেয়নি, ঘরে ঢুকে গেল।কিন্তু ঘর থেকে বের হয়নি এক মুহূর্তের জন্য। এ যেন এক সেচ্ছা কারানিবাস। ওকে ঘর থেকে বের করার জন্য দুই এক দিন খাবার দিতে নিষেধ করেছিলাম। তবু বের হয়নি ।আমরাই ওকে দেখতে যাই। ভেবেছিলাম শেকড় উপরে তুলে অন্য মাটিতে গাছ লেগে যাবে।তখন বুঝিনি সব গাছ হয়তো সব মাটির জন্য না।কতো ইচ্ছে ছিল ধুমধাম করে ওর বিয়ে দেব।সিঁদুর কপালে ওর প্রতিমার মতো মুখ খানা মন ভরে দেখবো।

                  দুজন অচেনা মানুষ, ভিন্ন জাত, ভিন্ন ধর্মের, এক অভিন্ন ঘটনার জন্য,  তাদের চোখে নোনা পানি।একে চোখের জল বা পানি যাই বলা হোক না কেন,অশ্রুর কোন জাত হয় না, যা কেবলি মনুষের আনন্দ-বেদনার বহিঃপ্রকাশ।

       –  কাকাবাবু, আপনি আর্যমাকে যেতে দেবেন আমার সাথে। আমি ওকে অয়নের কাছে নিয়ে যাবো।

               আগের সময় হলে এ কথা বললে আকাশকে ফেস করতে হতো এক গনগনে সূর্যকে। কিন্তু আজ সে অস্তগামী সূর্যের সামনে দাঁড়ানো।

–      আর রক্ত দূষণের কথা বলছেন,আপনার ছেলের শরীরে বইছে একজন মুসলমানের রক্ত । অয়ন তো তাও আপনার ধর্মের মানুষ। অয়ন হলে সূর্যের গতিপথ, সেখান থেকে অর্যমাকে সরানোর সাধ্য আমার-আপনার কারো নেই, এটি বিধাতার বিধান । দিন দিন করোনা মহামারীর আকার ধারণ করছে। গত তিন-চার শতকের মহামারীতে লক্ষ থেকে কোটি পর্যন্ত মানুষ মারা গেছে। আমাদের কার ভাগ্য কি আছে কে যানে। অর্যমা যেভাবে বেঁচেআছে তাকে কী বেঁচে থাকা বলে। মনে করেন না আপনার মেয়ে এই শতাব্দীর মহামারীর শিকার।

                        বাংলাদেশ-ভারত  সরকার তিন দিনের জন্য বর্ডার খুলে দিয়েছে। এরমধ্যেই  যারা দুই  দেশে আটকা পড়েছে তারা দেশে ফিরতে পারবে। একটা গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের দর্শনার দিকে। গাড়িতে কেউ কোন কথা বলছে না। আকাশ শুধু ছটফট করছে। জীবন নিয়ে বড্ড বড় এক জুয়া ধরে  ফেলেছে সে। যার হার জিতের উপর নির্ভর করছে তিন তিনটা জীবন।

ভোরের আলো ফুটতে আরো কিছু সময় বাকি আছে। এরমধ্যেই ওদের গাড়ি পৌঁছে যাবে বর্ডারে। সূর্যকান্তের কাছ থেকে চেয়ে এনেছে অর্যমাকে। শর্ত অয়নকে আসতে হবে দর্শনার বিজয়নগরে। অয়ন যদি সময়মতো পৌঁছাতে না পাওে, তবে শশীকান্ত অর্যমাকে নিয়ে কোলকাতা ফিরে যাবে। শেষ হবে অয়ন-অর্যমা অধ্যায়।

আকাশ যতোভাবে সম্ভব খবর দিয়েছে অয়নকে। চিঠি দিয়েছে এক ভদ্রলোককে যিনি প্রথম দিন দেশে ঢুকেছেন, সম্ভাব্য সব নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়েছে । সব খবরের একটাই সার কথা অয়নকে থাকতে হবে দর্শনার বিজয়নগর বর্ডারে। আকাশ তাই দেশে ঢোকার জন্য শেষ দিন বেছে নিয়েছে। অ-য়-নকে আসতেই হবে।

লকডাউনের কারনে কোনো পরিবহন চলছে না,অয়ন হেঁটে আসবে না উড়ে আসবে তা জানতে চায়না আকাশ। দিনের আলোতে একটু একটু করে  পরিস্কার হচ্ছে। আঁধারে মিলিয়ে থাকা গাছ-পালা, দুই দেশের মধ্যের লম্বা কাঁটা তারের বেড়া দৃশ্যমান হচ্ছে একটু একট করে।ওরা পৌঁছে গেল তাদের কাংখিত জায়গায়। সবার আগে আকাশ নেমে গেল,খোঁজার চেষ্টা করলো অয়নকে। কোথাও দেখা গেল না তাকে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর,  দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেল উপস্থিত। আকাশদের ঢুকে যেতে হবে বিজয়নগর।অর্যমা সকাল থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে। একটা কথাও বলেনি কারো সাথে। ওর সমস্ত কথা যেন জমিয়ে রেখেছে শুধুমাত্র অয়নের জন্যে। আকাশ ওদের ব্যগগুলো গাড়ি থেকে নামালো, বিদায় নিতে হবে অর্যমার কাছ থেকে। কি বলবে অর্যমাকে? হারিয়ে যাওয়া অমূল্য রতন হাতে পেয়েও আবার হারিয়ে ফেলতে হবে?

                                  আকাশ অর্যমার দিকে যাবে তখন দেখল অর্যমা এগিয়ে যাচ্ছে কাঁটা তারের বেড়ার দিকে। বিস্মিত নয়নে দেখলো ওপর প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে একটা ছেলে। উসকো -খুসকো চুল আর বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসছে অয়ন । দুজন কাঁটা তারের বেড়ার দুপাশে দাঁড়াল ।

দুজন মানুষ দুই দেশে দাঁড়ানো, মাঝে কাঁটাতারের ব্যবধান, এর মধ্যেও ওরা একে ওপরের হাত ধরল। কাঁটার খোচায় হাত বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। সেদিকে  কারো কোনো খেয়াল নেই। আকাশের মনে হলো ওরা যেন এই ভূবনের কেউ না। অন্য ভুবনের কেউ, যেখানে দেশ, সীমান্ত , ধর্ম কিংবা জাত কোনো কিছুই বিবেচ্য কিছু না।

 লেখক : নাজনীন পারভীন, অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :