একশন মুভি দেখতে দেখতে নিজেই এখন একশন হিরো

একশন মুভি দেখতে দেখতে নিজেই এখন একশন হিরো

সিনেমায় বেশিরভাগ ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যস্কট এডকিনস নিজেই করেন|ছবি : ট্রেইনম্যাগ

বক্সিং রিংয়ের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন ইউরি বয়কা। হালকাভাবে এক পায়ের ওপর থেকে আরেক পায়ে শরীরের ভার রাখছেন। একটু পরই শুরু হবে মরণপণ যুদ্ধ, বাঁচামরার লড়াই। শীতল চোখে পরখ করে নিচ্ছেন তাই শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে। রিংয়ের চারপাশে বসা দর্শকদের চোখেমুখে বুনো উল্লাস। সমানে তারস্বরে গলা ফাটাচ্ছেন তারা।

বয়কার পেটা শরীর। হাতে, পায়ে, বুকে ও পিঠে আঁকা ট্যাটু। ছোট করে ছাঁটা চুল। উত্তেজনায় শরীরের দুএকটি পেশী কাঁপছে তার তিরতির করে। চোখের অদৃশ্য জালে বেঁধে রেখেছেন ফাইটারকে; রেফারির সংকেতের জন্য অপেক্ষায় দুজনেই।

আনডিসপিউটেড-২ ছবির পোস্টার। ছবি: ইয়াহুডটকম

হলিউডের একশনধর্মী সিনেমা আনডিসপিউটেড-২ তে মারামারির দৃশ্যে এভাবেই হাজির হতেন ইউরি বয়কা। সিনেমার প্রধান চরিত্র ইউরি জেলখানার ফাইটার। ১৭ বছর আগে সিনেমাটি মুক্তি পায়, উদোম গায়ে খালি হাতে মারামারির কৌশলগুলো ছিল অভিনব ও শ্বাসরুদ্ধকর।

বক্সিং, জুডো, মার্শাল আর্ট, তায়েকোন্ডো ও কিক বক্সিং সবকিছুর প্রয়োগ ঘটে সিনেমায়। একশনের বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য দর্শকদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তাই এর কয়েকটি সিক্যুয়েলও বের হয় পরবর্তীতে।
অনেকেই মনে করত, সিনেমাচরিত্র ইউরি বয়কা বুঝি সত্যি সত্যি এমন মারামারি করে বেড়ান। যার বাড়ি রাশিয়ায়।

হ্যা, ইউরি বয়কা সিনেমার শুধুমাত্র চরিত্র-ই। আর এই ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছেন, তিনি রাশান নন একজন ইংরেজ। নাম স্কট এডওয়ার্ড এডকিনস। ১৯৭৬ সালের ১৭ জুন ইংল্যান্ডের ব্রিমিংহামে জন্ম । কয়েক প্রজন্ম ধরে এডকিনসের বাপ-দাদাদের প্রধান পেশা কসাইগিরি।

এমন পরিবারের ছেলে হয়েও তিনি মজেছিলেন সিনেমায় ও খালি হাতে আত্মরক্ষার যতগুলো মাধ্যম আছে সব শিক্ষণের উপর।

শৈশবে রাতদিন একশন সিনেমা দেখায় মত্ত থাকতেন এডকিনস। তার আগ্রহের বিষয়টি লক্ষ্য করে বাবাও নিয়ে আসতেন সিলভেরস্টার স্ট্যালোনের র‌্যাম্বো সিরিজসহ নতুন সব একশন সিনেমা।

পড়াশোনায় মন বসত না, রেজাল্ট আসত নিতান্ত সাদামাটা। বাবা-মা যখন ঘুমিয়ে পড়ত, দেখা যেত ছোট এডকিনস সিনেমা দেখছে রাত জেগে । এমন ছেলে ক্লাসরুমে যে পড়ে পড়ে ঘুমাবে সে কথা বলে দিতে হয় না।

মার্শাল আর্ট তারকা ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যান, জন ক্লদ ভ্যানডেম ও সিলভেরস্টার স্ট্যালোন হয়ে উঠে তার স্বপ্নের নায়ক। লক্ষ্য স্থির হয়, বড় হয়ে একদিন সেও রুপালি পর্দায় বিস্ময় জাগাবে।

স্ত্রী লিজা এডকিনসের সাথে স্কট এডকিনস। ছবি ম্যারিড উইকি

সেই স্বপ্নের রাস্তায় হাঁটার সময় তার জীবনে কয়েকটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। একদিন বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এক জায়গায় জুডোর প্রশিক্ষণ দেখে সে। আর যায় কোথায়, সেই ১০ বছর বয়সে ভর্তি হয়ে যায় জুডোর ক্লাসে।

নিয়ম করে প্রতিদিন চলত কঠোর অনুশীলন। অনুশীলনের সুবিধার্থে একসময় বাবার গ্যারেজটি কব্জা করে নেয়। ওখানেই স্থাপন করে ব্রুস লি’র সম্মানে একটি বেদী। অনুশীলনের আগে মাথা নুইয়ে গুরুকে সম্মান জানাতে ভুলত না এডকিনস।

তার বয়স যখন ১৩, আরো একটি ঘটনা ঘটে, যেটি তার মনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একদিন এডকিনস রাস্তায় ছিনতাইতারীদের মুখোমুখি হন। প্রতিজ্ঞা করে লড়াইটা মন দিয়েই শিখবেই শিখবে, শুরু করল মার্শাল আর্ট শেখা।

এরপর একে একে তিনি তায়েকোন্দো, কিক বক্সিং, নিনজুৎসু, ক্রাব মাগা, কারাতে, উশু, যিউয়েতসু, মুয়াই থাই, ক্যাপোইরা ও এক্রোবেটিক জিমনেসট্রিকসও অনুশীলন করেন। তায়েকোন্দোর ব্ল্যাক বেল্ট তার কোমরে উঠে মাত্র ১৯ বছর বয়সে।

প্রশিক্ষণ থাকায় সিনেমায় বেশিরভাগ ঝুঁকিপূর্ণ ও কসরতের দৃশ্য তিনি একাই করে ফেলেন। স্ট্যান্টের সাহায্য লাগে না। তাই তার একশনগুলো দর্শকের কাছে মনে হয় একেবারে বাস্তব, যেন চোখের সামনেই দুজনের ফাইট হচ্ছে।

ইউটিউবে সিনেমার মারামারি দৃশ্যগুলোর ভিডিও রয়েছে । ভিডিওগুলোর শিরোনাম ইউরি বয়কা ফাইট অথবা ইউরি বয়কা ফাইট সিন।

সিনেমায় ঢোকার ইচ্ছা থেকে অভিনয়টাও রপ্ত করেন ক্লাস করে। ২০০১ সালে হংকংভিত্তিক মার্শাল আর্ট সিনেমায় প্রথম ডাক পান তিনি। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে হংকংয়ের নামকরা সব একশনধর্মী চলচ্চিত্রনির্মাতাদের সঙ্গে। মাঝে অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলেও কোনোটাই প্রধান চিরত্র ছিল না।

স্পেশাল ফোর্সেস (২০০৩) সিনেমায় প্রথমবারের মতো বড় চরিত্র পান। কিন্তু সাফল্য আসে আনডিসপিউটেড ২: লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিংয়ে। রাশিয়ান আন্ডারগ্রান্ড ফাইটার বয়কা মূল ধারার চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মনযোগ কাড়তে সক্ষম হয়। তৎকালীন সময়ে আমেরিকায় বানানো সবচেয়ে সেরা মার্শাল আট সিনেমার একটি হিসেব সাব্যস্ত হয়।


এক্স ম্যান অরিজিনস: উলভারিন (২০০৯), দ্য লিজেন্ড অব হারকিউলিস (২০১২), ওলফ ওয়ারিয়র, আইপি ম্যান ৪: দ্য ফাইনাল, নিনজা ২, দ্য বোর্ন আলটিমেটাম, দ্য টুর্নামেন্টসহ বহু সিনেমা ও টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।

পেছনের গল্প শোনাতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এডকিনস বলেন, ‘৮০ এর দশকে একশন সিনেমায় দৈহিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে মারামারিটা জানার প্রয়োজন হতো। নায়ক হতে হলে আরনল্ড শোয়ার্জনেগার ও সিলভেস্টার স্ট্যালোন লাগত।’

ছোটবেলায় ঘরের দেয়াল ভরা থাকত একশন তারকাদের পোস্টারে। এতে চিন্তিত ছিলেন তার মা। ছবি : ট্রেইন ম্যাগ

‘কিন্তু দ্য ম্যাট্রিক্স সব চেনা দৃশ্য পাল্টে দেয়। দেখা গেল হালকাপাতলা শরীরের কিয়ানো রিভসও হতে পারেন মার্শাল আর্ট তারকা। তারপর বোর্ন সিরিজে দেখা গেল ম্যাট ড্যামনও ব্যাপক দক্ষতা দেখাচ্ছেন একশনে। বোঝা যাচ্ছে, পরিচালাকরা অভিনেতাদের দিয়েই পর্দায় মারামারির দৃশ্য করিয়ে নিচ্ছেন। শোয়ার্জনেগার বা সিলভেস্টার স্ট্যালোন না হলেও চলে।’

‘আমার মনে হয়েছে, দর্শক এখনো সত্যিকারের কসরত দেখতে চায়। তাই এক্সপেনডেবলস দর্শকপ্রিয়। ’

তিনি আরো বলেন, ক্লিন্ট ইস্টউডের চরিত্রগুলো তার প্রিয়। যেখানে পোড় খাওয়া শক্ত মানুষকে দেখানো হয়, যিনি কম কথা বলেন, এই ধরনের চরিত্রগুলো ভালোভাবে ফোটাতে পারি।

এডকিনস বলেন, ‘বাবা-মাকে প্রথম যখন বলি, আমি সিনেমা অভিনয় করব, ওরা বিশ্বাস করেনি। হয়তো ভেবেছে বড় হতে হতে সেটা উবে যাবে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি , সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি এটা করবই করব। নয়তো চেষ্টা করেই মরব।’

‘আমাকে নিয়ে মা উদ্বিগ্ন ছিলেন। আামার বয়সী ছেলেপুলের বেডরুমে অর্ধনগ্ন তারকাদের পোস্টার ঝোলানো থাকে। আর আমার ঘরের দেওয়ালগুলোতে শোভা পেত ভেনডমের অসংখ্য পোস্টার।’

ছোটবেলায় ব্রুস লি এডকিনসের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অপঘাতে মৃত্যু হয় তার। যাকে দিবারাত্রি দেখে বড় হয়েছেন, দৈহিক কাঠামো যার মতো গড়তে চেয়েছেন, সেই ক্লদ ভেনডেমকে তিনি পেয়েছেন খুবই কাছে। চার চারটি ছবিতে তারা একত্রে কাজ করেছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ছোটবেলার আরেক আইডল জ্যাকি চ্যান প্রবর্তিত বেস্ট একশন অভিনেতার পুরস্কারও ঢোকে তার ঝুলিতে।

এখানে মন্তব্য করুন :