একটিমাত্র পরিবার বাস করে যে দ্বীপে

একটিমাত্র পরিবার বাস করে যে দ্বীপে

নীল জলে ভেসে উঠা এ দ্বীপে বাস করে মাত্র সাতজন। ছবি : উইকিপিডিয়া

ডেনমার্কের আওতাধীন একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল ফারো দ্বীপপুঞ্জ । এই দ্বীপপুঞ্জে মোট ১৮ টি দ্বীপ রয়েছে। তারই একটি স্টোরা ডিমুন। রুপকথার গল্পের মতো এই দ্বীপে বাস মাত্র একটি পরিবারের।

এমন নয় পরিবারটি পরিত্যক্ত, মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। বরং প্রায়ই বিভিন্ন দেশের মানুষজন আসে দ্বীপে। কৌতুহলভরা চোখে উপভোগ করেন ঘাসে ভরা উঁচুনিচু সবুজ মাঠ।

স্টোরা ডিমুনের আয়তন মাত্র দুই দশমিক ৬৫ বর্গ কিলোমিটার। ঝড়ো হাওয়া না বইলে আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে বোটে করে যাওয়া যায় দ্বীপে। তবে হেলিকপ্টার চলে নিয়ম করে। ফারো দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী ট্র্যাভিয়ান। সপ্তাহের দুই তিন দিন হেলিকপ্টার মালামাল ও পর্যটক নিয়ে আসে ট্র্যাভিয়ান থেকে।


দ্বীপের মোট বাসিন্দা মাত্র সাত জন, এরমধ্যে তিনজন শিশু। আয়ের প্রধান উৎস ভেড়ার মাংস। এছাড়া সেখানে পর্যটকরা বেড়াতে আসেন, এর মাধ্যমেও আয় হয়। ভেড়ার মাংস ও চামড়া বিক্রি করা হয় ফারো দ্বীপপুঞ্জে। দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা স্টোরা ডিমুনের ভেড়ার মাংস খুব পছন্দ করে। কিন্তু এই পুরো চাহিদার যোগান দেওয়া সম্ভব হয় না।

ছবি : আইলিভএসআইড্রিমডটকম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দ্বীপের অধিবাসীদের জীবন কঠোর পরিশ্রমের। প্রতিটি কাজ সম্পাদন করতে হয় নিজেদের। পূর্ণবয়স্করা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কাজে নেমে পড়েন। বিভিন্ন বেলার খাবার তৈরি, ভেড়াসহ অন্যান্য গবাদি পশুর পরিচর্যাসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।

বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর কাজটি করেন মায়েরা।
পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে আলাদা কটেজ। সেখানে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগসুবিধা। বছরের অন্য সময় কটেজটি ব্যবহৃত হয় স্কুল হিসেবে।

ছবি : আইলিভএসআইড্রিমডটকম


অধিবাসীরা দিনের রুটিন নির্ভর করে আবহাওয়ার মেজাজ মর্জির উপর। তাদের বছর শুরু হয় বসন্তকালে। এই সময়কে তারা বলে ভেড়ার মৌসুম। তখন তাদের প্রধান কাজ হয়ে উঠে ভেড়ার দেখাশোনা করা। বসন্তের শেষে ভেড়া ও কুকুরগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাতে ভেড়াগুলোকে পরিচালন করা সহজ হয়।

এই বসন্তের সময়টাতে দ্বীপ ভ্রমণে আসে কিছু পর্যটক । সাধারণত তারা একদিনের নৌ ভ্রমণে আসেন। সৈকতে গিয়ে তাদেরকে অর্ভ্যথনা জানান পুরুষরা। ঘুওে দেখানো হয় দ্বীপটি। খেতে দেওয়া পানীয়সহ খাবারদাবার। সৈকত থেকে দ্বীপে উঠার পথ দুর্গম ও বিপৎসংকুল। তাই পর্যটকদের গাইড করে উপরে উঠানো হয়।
দ্বীপে রয়েছে একটি লাইট হাউজ, ২০০০ সালে এটি নির্মিত। অন্যান্য দ্বীপের লাইট হাউজ থেকে এটি নবীন।

সেপ্টেম্বরের দিকে মোটাতাজা ভেড়াগুলো জবাই করা শুরু হয়। গড়ে চারশ’ থেকে সাড়ে চারশ’ ভেড়া এক মৌসুমে জবাই দেওয়া হয়। এসময়টা ওদের জন্য একাধারে ক্লান্তিকর ও আনন্দদায়ক। ক্লান্তিকর এই অর্থে টানা কাজ করতে হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা।
আর আনন্দ হয় তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফল পায় বলে। অনেক পর্যটক এ সময় বেড়াতে এসে তাদেও কাজে সাহায্য করে।

ছবি: আইলিভএসআইড্রিমডটকম

শীতকালে অন্যরকম কাজ। ঘরবাড়িগুলো মেরামত করা হয় এসময়। এছাড়া ফেলে রাখা ভেড়ার চামড়াগুলো তখন প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে হাত দেওয়া হয়। বসন্ত আসার আগ পর্যন্ত ভেড়াগুলোকে ঘরের মধ্যে রাখা হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ খাইয়ে ভেড়াগুলোকে প্রস্তুত করা হয় মাঠে চরানোর জন্য।

১৮০৭ সালে জানুস ওলসেন এবং সরিন ওলসেন নামে দুইভাই সুম্বা দ্বীপ থেকে এ দ্বীপে আসেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল দুই ভাই মিলে একত্রে কিনে নিবে দ্বীপটি। কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন জানুস।

চুক্তিতে ভাইয়ের নাম বাদ দিয়ে শুধু নিজের নামই রাখেন। দু:খ পেয়ে সরিন এ দ্বীপ ছেড়ে চলে যান। আরেক দ্বীপে গিয়ে ঘর বাঁধেন। জানুস থেকে যান এ দ্বীপে। তিনি এই পরিবারের প্রথম পুরুষ, যিনি এখানে বসবাস শুরু করেন। তারপর থেকে আট প্রজন্মের স্মৃতি লেগেছে দ্বীপের পাথুরে ভূমিতে।


তথ্যসূত্র: স্টোরা ডিমুন ডটএফও, আইলিভএসআইড্রিমডটকম।

এখানে মন্তব্য করুন :