আমাদের সাজেক

আমাদের সাজেক

পাহাড়ের রাণী কিংবা মেঘের স্বর্গ যাই বলি না কেন, সাজেক দেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১৮০০ ফুট উপরে পাহাড় আর মেঘেদের খেলা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ভোরের সূর্যোদয় দেখার জন্য রিসোর্টের বারান্দায় বা খোলা পাহাড়ের চূড়ায় যখন যাবেন, অথবা সূর্য দেখা না গেলেও মেঘের যে ভেসে বেড়ানো ভেলা দেখবেন, তা আপনার মনের গহীনে সারাজীবনের জন‌্য গেঁথে যাবে।

প্রশান্তির একটি নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাবে হৃদয়লোকে, এ যেন মেঘের সমুদ্রের মাঝে আরেক ভূবন। পাহাড়ের সবুজ, সাদা মেঘ আর স্বপ্নের রঙ নীল মিশে একাকার।

প্রথম দিন আমরা কক্সবাজার থেকে রওনা দিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছাই। সকালে রওনা দিলেও পৌঁছাতে পৌঁছাতে  সন্ধ্যা ৭ টা। গাড়ি থেকে নেমে শাপলা চত্তরের কাছাকাছি একটি বাজেট হোটেলে রুম নিয়ে নিলাম। রুমে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন সকালে সাজেক যাওয়ার চাঁদের গাড়ি এবং একটি দল খুঁজতে  শুরু করলাম।

জানতে পারলাম ভোর ৬ টায় শাপলা চত্ত্বর থেকেই সব গাড়ি ছেড়ে যায়। যেকোনো দলও সহজেই পাওয়া যাবে। তাই নিশ্চিত মনে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে আমরা ৩ জন আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

পরদিন ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে ওঠেই ফ্রেশ হয়ে শাপলা চত্ত্বর চলে গেলাম। আমরা ১০ জনের একটি দলে ভিরে গেলাম।  এখন আমরা ১৩ জন সদস্য। সকালের নাস্তা সেরে গাড়িতে চেপে বসলাম। সকাল ৭.৩০ টায় গাড়ি চলতে শুরু করলো। ৯ টায় পৌঁছালাম যেখান থেকে আর্মি এসকট শুরু হবে সেখানে। সব গাড়ি লাইন দিয়ে জড়ো হতে লাগলো। ১০.২০ মিনিটে সব গাড়ি সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা হলো পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে।

দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে সাজেকে প্রবেশ করলাম। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। মেঘ যেন সারা সাজেকের রাজত্ব নিয়ে নিয়েছে।  গাড়ি থেকে নেমে বাজেট হোটেল খুঁজতে লাগলাম এবং ২০ মিনিটের মধ্যে খুব সস্তায় রুম পেয়ে গেলাম আমাদের জন্য। রুমের বারান্দা থেকে ঐ দূরের পাহাড় আর মেঘের খেলা মুগ্ধ করছিল আমাদের। খাবারের অর্ডার দিয়ে রুমে বিশ্রাম নিলাম।

দুপুর দেড়টায় রুম থেকে বের হয়ে খাবার খেয়ে রওনা দিলাম কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্য। কি এক মনোরম দৃশ্য, চারপাশ মেঘে ঢাকা, বাতাসের ছন্দে মেঘ যেন খেলা করছে। আমার মতে সাজেকের সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য বা অনুভূতি হচ্ছে সাজেকের রাস্তায় হাঁটা, আর দুপাশের নৈসর্গিক সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা। যারা দার্জিলিং গিয়েছেন তারা বুঝবেন এই সাজেকের আবেদন কতটুকু। তাই তো আমি বলি, “আমাদের একটি সাজেক আছে”। ৪৫ মিনিট হাটার পর কংলাকের চূড়ায় উঠে আমি তো হতবাক, মেঘ এত বেশি ঘন ছিল যে, আমার ৫ ফিট পাশের লোককেও ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। আর মৃদু বাতাস হালকা শীতলতার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে আমায়।

কিছুক্ষণ পরে সূর্যমামার দেখা পেলাম, ততক্ষণে মেঘ সরে গেছে। এবারের দৃশ্য টা আরো অসাধারণ ও নৈসর্গিক। ঐ দূর পাহাড়ের ঢালে সাদা শুভ্র মেঘ ও সবুজের মিলন অক অন্য আবেদন তৈরি করেছে। প্রাণভরে উপভোগ করলাম এই মুহুর্ত টুকু। আমি যখন ২০১৫ সালে কংলাকে উঠেছিলাম তখন কিন্তু কংলাকে এত রিসোর্ট ছিলো না।  

এখন প্রায় ২০ টার বেশি রিসোর্ট আছে এবং এগুলো খুবই চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। যারা একদম নিরিবিলি তে সময় ও মুহুর্ত উপভোগ করতে চান তাদের জন্য সোনায় সোহাগা। আমি আগে জানলে এখানেই রিসোর্ট নিতাম। যাই হোক পরবর্তীতে আবার আসা যাবে, তখন কংলাকের চূড়ায় থাকবো।

সূর্য আবারো মেঘের আড়াল হয়ে চারিপাশ মেঘে ঢেকে গেলো। কি এক অনুভূতি তা বুঝতে হলে আপনার ও এখানে আসতে হবে ঠিক এই সময়। শরত বা হেমন্তের সময়ে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করতে পারবেন এই সাজেক থেকে। কংলাকের চূড়ায় জাম্বুরা গাছ থেকে জাম্বুরা পেড়ে মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হলো টাকার বিনিময়ে। এই তরতাজা জাম্বুরার স্বাদ মুখে লেগে আছে এখনো। প্রায় ১ ঘন্টার ও বেশি সময় কংলাকের চূড়ায় অবস্থান করে নিচে নেমে আসলাম ৩০ মিনিটে।

এসেই হেলিপ্যাডে বসে সূর্যাস্ত দেখার জন্য অপেক্ষা করলাম। আকাশ মেঘলা থাকায় এবং খুব বেশি ঘন মেঘের কারণে সূর্যাস্ত ভালোভাবে দেখা যায়নি, কিন্তু মেঘ-পাহাড়ের যে খেলাটা দেখেছি সেটাই দুচোখ ভরিয়ে দিয়েছে। এখানে বসেই বেম্বু চা খেলাম তৃপ্তি নিয়ে। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে হেটে হেটে রুমে এসে সামান্য বিশ্রাম নিলাম।

রাত ৮ টায় রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর সবাই মিলে গিটার নিয়ে চলে গেলাম হেলিপ‌্যাডে। গোল করে বসে আমরা ৯ জন ২ ঘন্টা গলা ছেড়ে বাংলাদেশের সব জনপ্রিয় গানগুলো গাওয়ার চেষ্টা করলাম। আশেপাশের লোকজন ও আমাদের সাথে যোগ দিয়ে গান গাইল। রাত সাড়ে টায় রুমে এসে বারান্দায় বসে আরেক দফা রাতের সাজেক উপভোগ করেছি।

এরপর ঘুমানোর চেষ্টা করলাম । কিন্তু ঘুম আর আসে না। তাই আবারো বেরিয়ে পরলাম সাজেকের রাস্তায়। এ আমি কি দেখছি? রাতের সাজেক এত সুন্দর! মেঘের ভেলায় স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে হাঁটতে লাগলাম। প্রায় ১ ঘন্টা মধ্যরাতের সাজেকের রাস্তায় হেটে রুমে এসে ঘুম দিলাম।

৩য় দিন ভোর ৫.৪০ টায় ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পরলাম কংলাকের উদ্দেশ্যে। কারণ আমি জানি এইসব পাহাড়ের চূড়ায় সকালের পরিবেশ ও দৃশ্য কি অপরূপ হয়। যেহেতু দার্জিলিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে ঝুলিতে। আমি একা একা কংলাকের পথে হাটছি। কি অপূর্ব এই সকাল, ঠিক যেন কোন মায়াপরীর দেশে আছি। খুব তাড়াতাড়িই কংলাকের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। চূড়া থেকে চারিপাশের পাহাড় – মেঘের মিতালী এক ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানে প্রায় ৪৫ মিনিট চুপচাপ বসে উপভোগ করেছি অসাধারণ কিছু মুহুর্ত। তারপর নিচে হেলিপ্যাডে এসে চা খেয়ে নিলাম তৃপ্তি সহকারে। সেদিনই আমরা ফিরে আসি আমাদের ঠিকানায়।

৩টি পরামর্শ 

রাত ১২ টার পরে অর্থাৎ মধ্যরাতে সাজেকের রাস্তায় হাঁটবেন।

খুব ভোরে অর্থাৎ সুবেহ-সাদিকের সময় হেঁটে কংলাকে রওনা দিবেন।

শুক্রবার বা ছুটিরদিন ছাড়া সাজেক যাবেন।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে -ঢাকা -খাগড়াছড়ি-সাজেক। চাইলে দীঘিনালাও যেতে পারেন। আবার ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকেও খাগড়াছড়ি যেতে পারেন। বাংলাদেশের যেখান থেকেই আসেন না কেন, সকাল ৭ টার মধ্যে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্ত্বরে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।

খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা দুই জায়গা থেকেই চান্দের গাড়ি পাওয়া যায়। চান্দের গাড়ি দিয়ে আর্মি ক্যাম্প হয়ে সাজেক যেতে হয়। দিনে দুইবার আর্মি এসকর্ট ছাড়ে, একটি সকাল ১০.৩০ টা এবং বিকাল ৩.৩০ টায়। পথে পড়বে ১০ নং বাঘাইনঘাট আর্মি ক্যাম্প যেখান থেকে আপনাকে সাজেক যাওয়ার অনুমতি নিতে হবে।

চান্দের গাড়ি ভাড়াঃ- ১ রাতের জন্য ৭০০০-৮০০০ টাকা (১২ – ১৬ জন পর্যন্ত বসা যায়)

কোথায় থাকবেন

 সাজেকে থাকার জন্য অনেক রিসোর্ট আছে, সিজনে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাবেন, অফ সিজনে সাজেক গিয়েও বুকিং দেয়া যায়। তবে সাজেক গিয়ে ভাল করে দেখে বুকিং দিলে বেশি ভাল হয়। ভাল ভিউ পাওয়া যায় এমন কয়েকটা রিসোর্ট হলো, মেঘ মাচাং, মেঘপুঞ্জ,মেঘের ঘর, জুম ঘর। তাছাড়া ৭০ টার মত রিসোর্টে আছে এখানে।

রিসোর্ট ভাড়া

 অন সিজন এবং ছুটির দিনে ২০০০ থেকে ৭০০০ টাকা। অফ সিজন এবং সাধারণ দিনে ৬০০ থেকে ৩৫০০ টাকা।

কোথায় খাবেন

 সাজেকে খাওয়ার জন্য আগে অর্ডার করতে হয়, আপনি যেকোন সময় গেলেই খাবার পাবেন না। মিনিমাম ১/২ ঘন্টা আগে অর্ডার করা ভালো।

প্রতিবেলা খাবারের বিভিন্ন প্যাকেজ আছে।

১.ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+দেশি মুরগি =২০০টাকা

২.ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+ফার্মের মুরগি =১৫০টাকা

৩.ভাত+ডাল+আলুভর্তা=১০০ টাকা

রাতে ব্যাম্বো চিকেন অথবা বার-বি-কিউ খেতে পারেন,দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

লেখক: আসিফ হায়দার, ব্যবসায়ী, কক্সবাজার।

এখানে মন্তব্য করুন :