অনুভূতি

অনুভূতি

নাদিমের ঘুম ভাঙ্গতে আজ একটু দেরি হয়ে গেল। মিস্টার বিনের মত লাফাতে লাফাতে দাঁত ব্রাশ করে, চুলে কোনমতে চিরুনী বুলিয়েই সে বের হয়ে গেল। জামা-কাপড় বদলানো লাগবে না। কাল টিউশনি থেকে ফিরে কাপড় না পাল্টেই সে শুয়ে পরেছিল। এখন ভার্সিটিতে মিড-টার্ম পরীক্ষা চলছে।

গতকাল দুপুরে পরীক্ষা দিয়ে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে, আজকের পরীক্ষার পড়া আগেই রিভাইস দিয়ে সন্ধ্যাবেলা নাদিম গিয়েছিল ছাত্র রনিকে পড়াতে। সেখানে আপা-মানে রনির মা রাতের খাওয়া খাইয়ে দিলেন। খেয়ে আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই মেসে ফিরে টায়ার্ড শরীরটা কোনমতে বিছানায় ছুড়ে দিয়েই নাদিম ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল।

এই টিউশনটা নাদিমের জন্য অনেক ভালো হয়েছে। বেতন ভালো, আর সবচেয়ে কাজে আসে যে জিনিশ-তা হলো, নাস্তা এত ভালো দেয়, প্রায় রাতেই নাদিমকে আর কিছু খেতে হয়না। একেবারে অজপাড়াগাঁ থেকে ঢাকা শহরে পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী মাত্রই টিউশনিতে গিয়ে নাস্তা করার নেয়ামত বুঝবে। এটা ছ্যাচড়ামো নয়, এভাবেও অনেকের জীবন চালাতে হয়! নাদিমের বাবা ছেলের জন্য কোন খরচই পাঠাতে পারেন না।

নিজেরাই গ্রামে কোনমতে টিকে আছেন, নাদিমকে কোথা থেকে টাকা পাঠাবেন? পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে টিউশনই নাদিমের এ শহরে টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ভার্সিটি হলে সিট পেতে হলে শক্ত পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড লাগে, যা নাদিমের নেই।  বাইরে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা বাসায় মেস করে থাকতে খরচ একটু বেশিই পড়ে, তাও নাদিম অভিযোগ করে না। মেসে অন্তত ওর পড়াশোনাটা ঠিকমত হচ্ছে।

হলে থাকা ওর বন্ধুরা তো বলেই- সারাদিন এই-ঐ নেতা ভাইদের ডাকাডাকিতে পড়ার জো নেই। নাদিমের যে পড়া ছাড়া গতি নেই। ভার্সিটিতে ওর বন্ধুদের যে পারিবারিক আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস, তার সাথে নাদিমের মত একটা ছেলের খাপ খাওয়ার কথা নয় মোটেই, কিন্তু স্রস্টা প্রদত্ত জিনিয়াসের কল্যাণে সবাই ওকে নমঃনমঃ করে। তা তার পরনের কাপড়-চোপড়, বা হাতের ঘড়িটা যতই কম দামী হোক না কেন।

বন্ধুরা তো ওকে সামনা-সামনিই কিপটা বলে ডাকে, তাতে নাদিম শুধু ছোট্ট করে একটু মুচকি হাসি দেয়। আর কী ই বা করবে সে? ওর দুই দিন পরপর নিত্য নতুন রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের ট্রিট দেওয়ার সাধ্য নেই, দলবল বেঁধে সারাদেশ ট্যুর দিয়ে বাকেট লিস্ট পূরণ করার ক্ষমতা নেই।যার বাকেটই ফুটা, তার আবার বাকেট লিস্ট! মনে মনে হাসে নাদিম। নিজের খরচ চালিয়ে বাড়িতে বাবাকে অল্প কয়েকটা টাকা পাঠায় মাসে মাসে। সেটুকুই বাবার জন্য অনেক পাওয়া।

আপার পড়া বন্ধ, নাদিম ছেলে দেখে ওকে শিক্ষিত বানাতে বাবা তার সম্বলের পুরোটাই ওর পিছনে খরচ করে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। নাদিম খুব চায়, আপাটা আবার পড়া শুরু করুক। ও খরচ দিবে। কিন্তু এখনো তো নিজের পড়াই শেষ হয়নি। টিউশনের টাকা দিয়ে তো এত কিছু করা যায়না।

রাহাত পেঁচার মত মুখ করে আছে। পরীক্ষা খারাপ হলো নাকি? রাহাত আর নাদিম যৌথভাবে ওদের ব্যাচের ফার্স্ট পজিশনে আছে। ও না পড়ে আসলেও পরীক্ষা কখনো খারাপ হয়না। তাহলে ঘটনা কী? নাদিমের প্রশ্নে কিছুক্ষন গাঁইগুই করে রাহাত বললো-টুম্পা ওর সাথে ভালোমত কথা বলছেনা, তাই মেজাজ খারাপ। অন্যের দুঃখে হাসতে নেই, কিন্তু নাদিমের হাসি উঠে যায়। অনেক কষ্টে মুখ স্বাভাবিক রেখে সে রাহাতের সাথে কথা চালিয়ে যায়। রাহাতকে দেখে ওর মাঝে মাঝে অবাক লাগে।

একই গন্তব্যের যাত্রী ওরা দুজন, কিন্তু দুজনের যাত্রার স্টাইলে কত পার্থক্য। রাহাতের গায়ে সবসময় ব্র্যান্ডের কাপড়, পায়ের শু-জোড়া ইমপোর্টেড। ঢাকার সবচেয়ে নামকরা স্কুল-কলেজে পড়েছে। চোস্ত ইংরেজিতে একটানা বিতর্ক করে যেতে পারে। ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা ওর গার্লফ্রেন্ড।

নাদিম যখন সারাদিন ক্লাস করে টং থেকে পাঁচ টাকার সিঙ্গাড়া কিনে দুপুরের লাঞ্চ করে, রাহাত সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ওর গ্রুপের বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে একেক দিন একেক রেস্টুরেন্টে খেয়ে এসে ফুড রিভিউ দেয়। নাদিমের কোন গার্লফ্রেন্ড বা এমনি মেয়ে বন্ধু নেই- ওর মুখচোরা স্বভাবের জন্য? আসলে তা না। গার্লফ্রেন্ড চালানোর সামর্থ নাদিমের নেই। এই দুইদিন পরে পরে গিফট, এখানে সেখানে ঘুরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া- না বাবা, এগুলো করলে এ জীবনে আর বাবা-মায়ের জন্য কিছু করা হবেনা।

বাড়িতে টিনের চালা ভেঙ্গে পড়ছে, ঠিক করাতে হবে। মায়ের চোখে ছানি পড়েছে, অপারেশন লাগবে। বাবার সঞ্চয় সব শেষ, আপার বিয়ের কথাবার্তা চলছে- কীভাবে কী হবে? গার্লফ্রেন্ডের বিলাসিতা কি নাদিমের মানায়? তাই রাহাতের রাগের কারণ শুনে নাদিমের হাসি আসে। যাক বাবা, আমার  গার্লফ্রেন্ড ও নেই, মুখ কালাকালিও নেই- মনে মনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে বেচারা।

এদিকে রাহাত গজরাতে থাকে- “ ও কি ভেবেছে? ও কথা না বললে আমার বয়েই গেল? আমিও কথা বলবোনা। বেদনাহত বন্ধুকে সান্তনা দিয়ে নাদিম মেসে ফিরে আসে। দুপুরে খাওয়ার টাইম নেই। ইতিকে পড়াতে যেতে হবে। ইতির বাসায় চা-বিস্কুট পাওয়া যাবে যদিও। ওটা খেয়েই আজ শোকর করা লাগবে। বেরুনোর মুখে পিওন আসে, বাবার চিঠি এসেছে। নাদিম চিঠিটা সাথে নিয়ে ইতির বাসায় চলে আসে। ওকে অংক বুঝিয়ে নতুন সমস্যা সমাধান করতে দিয়ে, সাবধানে চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করে।

যা ভেবেছিল, তাই। আপার বিয়ে। বাবা পাগল হয়ে গেছেন মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আপাটা কত ভালো ছাত্রী ছিল, নাদিমের হাতেখড়ি তো আপার কাছেই। কিন্তু গ্রামের হিসাবে আপার বেশ বয়স হয়ে গেছে, বাবা তাই হন্যে হয়ে কিছুদিন ধরে পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পেয়েওছিলেন ভালো কিছু সম্বন্ধ, কিন্তু ওরা চড়া যৌতুক চায়। তাই কোনখানেই শেষ পর্যন্ত কথা গড়ায়নি। তবে এবার বাবা খুব খুশি। পাশের গ্রামে উনার দুঃসম্পর্কের এক বোনের ছেলের জন্য আপাকে তারা পছন্দ করেছে। তারা বেশী কিছু চায়ও না। জনা পঞ্চাশেক মানুষ নিয়ে বরযাত্রী আসবে, আর শুধু বরকে দামী একটা ঘড়ি দিতে হবে।

বাবা নাদিমকে বলেছেন-কিছু ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখতে। এত মানুষ খাওয়াতেই তো অনেক টাকা লাগবে। আবার ঘড়ি আসবে কীভাবে? নাদিম শুকনো মুখে ইতিকে পড়ানো শেষ করে। এখন মাসের মাঝামাঝি সময়। কোন ছাত্রের বাসা থেকেই এখন বেতন পাওয়া যাবেনা। মাস শেষ হলেও অনেক বাসায় চেয়ে চিনতে পাওনাটা নিতে হয়, আর অর্ধেক মাসে তো কেউ টাকা দিতেই চাইবেনা। নাদিম কখনো বন্ধুদের কাছে হাত পাতেনা, এটা সে কোনভাবেই করতে পারবেনা। জীবনের কিছু নীতির সাথে কেন যেন আপোষ করা যায়না।

মেসে ফিরে গায়ে মাথায় পানি ঢেলে নাদিম মনটাকে হাল্কা করতে চায়। কেন জীবন একেকজনের জন্য একেক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে রেখেছে? এই সামান্য কটা টাকার জন্য এবারও কি আপার বিয়ে হবেনা? না হয়, নিজের নীতির সাথে বেঈমানি করা হলো, তবু নাদিম ভাবে এবার ওর বড়লোক বন্ধুদের কাছেই হাত পাতবে সে।

পরদিন আবার রাহাতের ভোঁতামুখ। টুম্পার সাথে নাকি কাল রাতে ব্রেক-আপ হয়ে গিয়েছে। এখন সে মিহির, বিলাস ওদেরকে নিয়ে সুলতান’স ডাইনে গিয়ে ব্রেক-আপ পার্টি করবে। টুম্পা ওকে এতদিন যে সব গিফট দিয়েছে, সেগুলো একটা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে-ওকে ফেরত দিয়ে দেবে! কিন্তু টুম্পাকে কোথায় দেখা যাচ্ছেনা। বিশ্বস্থ বন্ধু নাদিম আছে না? “ তুই টুম্পাকে এই ব্যাগটা দিতে পারবি?” নাদিম বন্ধুর জন্য এটুকু তো করবেই, আবার বলা লাগে?

টুম্পা নাদিমের হাত থেকে প্রায় খামচি দিয়ে ব্যাগটা ছিনিয়ে নেয়। সব কিছু মাটিতে উপুড় করে ঢেলে রাগে ফোঁসফোঁস করতে থাকে-“ আমাকে ওর মত ফকিন্নি পাইসে নাকি? গিফট ফেরত দিয়ে ছোটলোকামী করছে- নাদিম, তোমার লজ্জা লাগেনা, এমন একটা ছোটলোকের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে? এসব ফেলে দাও ঢিল দিয়ে খালের পানিতে।“ আশেপাশের অনেকেই মুখ টিপে হাসছে। হতভম্ব নাদিম মাটিতে পরে থাকা গিফটগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

****

আপা কেঁদেকেটে চলে গেল শ্বশুড়বাড়ি। সবকিছুই সামাল দেওয়া গেছে শেষ পর্যন্ত। নাদিমের দুলাভাই স্মিত হেসে নিজের র‍্যোলেক্স ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখছিল একটু পরপর। ওরা এত দামী ঘড়ি দিবে, সে ভাবতে পারেনি। নাদিমের বাবা খুব খুশি। ছেলেটা উনার মান সম্মান রেখেছে। নিশ্চয়ই বাছার অনেক কষ্ট হয়েছে এত টাকা জোগাড় করতে। নাদিমের মনে একসাথে অনেক অনুভুতি খেলা করছে।

স্বস্তিঃ যাক-আপার বিয়েটা হলো।

লজ্জা- নিজেকে কোথায় নামানো লাগলো সব জোগাড়-যন্ত্র করতে!

দুঃখ- রাহাত আর টুম্পার যে ব্রেক-আপ হয়ে গেল।

স্বস্তিঃ ভাগ্যিস, রাহাত আর টুম্পার ব্রেক-আপ হয়ে ছিল!

লেখকঃ মেহজেবীন আক্তার, পিএইচডি গবেষক,শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

এখানে মন্তব্য করুন :